বিয়ের প্রথম রাতেই মারুফ তৃনাকে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিলো, শোনো তোমাকে কয়েকটা কথা জানিয়ে রাখছি । কথাগুলি খুব মন দিয়ে শোনো । আগেভাগেই বলে রাখছি যেন এ নিয়ে পরে কোনো ঝামেলা তৈরি না হয় । তৃনা বলল, আগেভাগে বলে রাখো । সেটাই ভালো । পরে ঝামেলা হোক আমিও চাই না ।
মারুফ বলল, এক নম্বর কথা, আমার জীবনে তুমি এসেছ তার মানে এই না আমার জীবন এখন তোমার । সেখানে তোমার অবাধ অধিকার । প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে প্রাইভেসি থাকে । আমি যা বলতে চাই তা হলো আমি কখন কী করি না করি এ নিয়ে অতিরিক্ত কৌতূহল দেখানো যাবে না । কোনো প্রশ্ন করা চলবে না । প্রশ্ন করা জিনিসটা আমি একদম পছন্দ করি না । তোমাকে আরেকটা কথা জানিয়ে রাখি । আমার জীবনে একটা প্রেম আছে । সেই প্রেম থাকবে । বিয়ে হয়ে গেলো মানে সব শেষ এরকম ভাবার কোনো কারণ নেই । তুমি হয়তো বলতে পারো তোমাকে তাহলে কেন বিয়ে করে আনলাম । এই প্রশ্নের উত্তর আমি তোমাকে দিতে পারবো না । আমার বাবা মা ভালো দিতে পারবেন । আমি খুবই খারাপ ছেলে । তবে আমার মা বাবার কখনও অবাধ্য হই না । খুব খারাপ ছেলেরা পিতা মাতার বাধ্য সন্তান হয় । এর কারণ হলো তারা পাপের মধ্যে ডুবে থাকে । মা বাবার দোয়া আশীর্বাদ সম্বল করে তারা সেই পাপ খণ্ডন করতে চায় । আমার জীবন পাপে নিমজ্জিত । তবে হ্যাঁ । প্রত্যেকটা খারাপ মানুষের কিছু ভালো দিকও আছে । আমার ভালো দিকটা হলো আমি কখনও মিথ্যা বলতে পারি না ।
তৃনা মন দিয়ে শুনছে । মারুফ কখনও মিথ্যা বলে না এই কথাটা তার ভালোলেগেছে । তার মানে মানুষটা ভালো । একটা মানুষ মানুষ হিসাবে কীরকম তার মাপকাঠিই হলো সে কতটা সত্যবাদী ।
মারুফ বলল, কথা নম্বর দুই, আমি বাবা মার বাধ্য সন্তান হলেও তাদের সঙ্গে আমি কিন্তু খুব দুর্ব্যবহার করি । তোমার তা করলে চলবে না । তোমার আচরণ হতে হবে নরম । মোমের মতো নরম । ওনারা যদি তোমাকে বলেন আগুনে হাত দাও তুমি আগুনে হাত দেবে । হাত পুড়ে যেতে পারে এই চিন্তা করা যাবে না ।
তৃনা বলল, ঠিক আছে । আগুনে হাত দেবো । হাত পুড়ে ছাই হয়ে যাক । পরোয়া করবো না । I don’t care । কোন হাত আগুনে দেবো ? ডান হাত নাকি বাম হাত ?
মারুফ হেসে বলল, Intelligent question । তোমার sense of humor তো ভালো । I appreciate । বুদ্ধিমতি মেয়েদের আমার খুব পছন্দ ।
তৃনা বলল, আর কোনো শর্ত আছে ? থাকলে বলে ফেলো । পরে হয়তো ভুলে যাবে ।
মারুফ বলল, এই জাতীয় Terms and Conditions তুমি আশা করো নি তাই না ? তুমি হয়তো ভেবেছিলে বাসর রাতে সুন্দর সুন্দর কথা শুনবে । I am sorry ।
তৃনা হেসে বলল, গরীব ঘরের মেয়ে বিয়ে করে এনেছ । আমাকে যে কঠিন কঠিন শর্তের মুখে পড়তে হবে এ তো জানা কথা ।
মারুফ বলল, তুমি কিন্তু বেশ রূপবতী । একটা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে করতে । তোমার জীবনটা নষ্ট হতো না । হয়তো ছেলেটা তোমাকে মাথায় করে রাখত । আমার কাছে কেন আসলে ?
তৃনার এতো মন খারাপ হয়েছে । তার রূপ যৌবন মানুষটাকে আকর্ষণ করছে না । অপমানে তৃনার কান্না করতে ইচ্ছা করছে । উপযুক্ত পরিবেশ হলে হয়তো কান্না করে দিতো । এই লোকটার সামনে সে কাঁদতেও পারছে না ।
মারুফের ফোন বাজছে । মারুফ তৃনাকে বলল, এক্সকিউজ মি । বলে সে ফোন রিসিভ করলো ।
হ্যাঁ অদিতি বলো ।
অদিতি কথা বলছে না । মৃদু কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে ।
মারুফ বলল, Are you crying ? কান্না করার মতো কিছু কি হয়েছে ? একটা বিয়েই তো করেছি । অতি সামান্য ঘটনা । অতি সামান্য বলাও ভুল হবে । এটা কোনো ঘটনাই না । Don’t cry baby . I love you ।
মারুফ ফোন রাখল । তৃনাকে বলল, কে ফোন করেছে বুঝতেই পারছ ?তৃনা বলল, বুঝতে পারছি । কথা এতো সংক্ষেপে শেষ করলে কেন ?মারুফ বলল, তুমি কি ভেবেছ তোমার ভয়ে ?
না । আমি তা ভাবি নি । কাউকে কাঁদতে দেখলে আমার খারাপ লাগে । মেয়েটার সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথা বলা উচিত ছিল ।
মারুফ বলল, আমার জন্য এক কাপ চা করে নিয়ে আসো তো । মাথা ধরেছে । অবশ্য তোমার অসুবিধা থাকলে দরকার নেই । আমি কনাকে বলছি ।
আমার কোনো অসুবিধা নেই ।
তৃনা রান্নাঘরে চা বানাচ্ছে । কনা এসে বলল, কী ব্যাপার ভাবি ? ফুলশয্যার রাতে তুমি রান্নাঘরে ? আজ কি তোমার রান্নাঘরে আসার কথা ? এই রাতটা কি প্রতিদিন আসবে ?তৃনা বলল, তোমার ভাইয়ের জন্যে চা বানাচ্ছি ? কনা বলল, ভাইয়া কখনও রাতে চা খায় না । সে এই কাজটা তোমাকে দিয়ে কেন করাচ্ছে বুঝতে পারছ না ? তুমি তার প্রতি কতটা লয়াল সে পরীক্ষা করছে । বজ্জাত একটা । ভাবি তোমাকে একটা কথা বলি । জানি তোমার মন খারাপ খারাপ হবে । তুমি অনেক বড় ভুল করেছ ভাবি । যাকে বিয়ে করেছ সে একটা অমানুষ । তুমি একটা অমানুষের হাতে পড়েছ । তোমার আরও জেনে শুনে এই বিয়েতে মত দেওয়া উচিত ছিল । নিজের ভাই সম্বন্ধে মন্দ কথা বলতে হচ্ছে । I am sorry । বাট সে তোমাকে যন্ত্রণা দেবে । কঠিন যন্ত্রণা দেবে । তৃনা হেসে বলল, আমি তার তিন গুন যন্ত্রণা তাকে দেবো । Just wait and see ।
কনা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পরপরই তৃনার শ্বশুর ইয়াকুব সাহেব রান্নাঘরে উপস্থিত । তৃনাকে এখানে দেখে তিনি খুবই আশ্চর্য । নতুন বৌমাকে রাগ করতে সংকোচ হচ্ছে তারপরও তিনি রেগে বললেন, তুমি এখানে কেন ? Why are you here ? তোমার ঘরটা ( বাসর ঘর শব্দটা তিনি উচ্চারণ করলেন না । বোধহয় লজ্জা পেয়ে উচ্চারণ করেন নি । ) সাজানো হয়েছে Fifty Thousand, পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ করে । সেই ঘর ফেলে রেখে তুমি রান্নাঘরে ? What nonsense ? তৃনা বলল, আপনার ছেলের খুব মাথা ধরেছে । উনি এক কাপ চা খেতে চেয়েছেন । ইয়াকুব সাহেব আশ্চর্য হয়ে বললেন, সে বলল আর তুমি বিশ্বাস করলে ? তৃনা বলল, হ্যাঁ, করলাম । বিশ্বাস না করার তো কোনো কারণ নেই । ইয়াকুব সাহেব আগ্রহ নিয়ে জিগ্যেস করলেন, আমার ছেলে তোমাকে কী কী বলল ? আমাদের সম্বন্ধে কী বলেছে ? আমি আর তোমার শাশুড়ি সম্পর্কে কী বলেছে বলো । নিশ্চয়ই খুব খারাপ কথা বলেছে ? তৃনা বলল, না বাবা । খুব ভালো কথা বলেছে । উনি যে আপনাদেরকে কতটা ভালোবাসেন আপনারা কেউ বোধহয় সেটা জানেন না । ইয়াকুব সাহেব উদ্বেলিত হয়ে বললেন, কী বলেছে সে ? বলো । তৃনা বলল, উনি আমাকে বললেন – আমার বাবা মা যদি তোমাকে আগুনে হাত দিতে বলেন তুমি আগুনে হাত দেবে । বাবা আগুন সামনে আছে । আপনি হুকুম করুন । আমি আগুনে হাত দিই । ইয়াকুব সাহেব হাঁ করে তাকিয়ে থেকে বললেন, এ সব কী বলছ ? কুলাঙ্গারটা এই কথা বলল ? জানোয়ারের কথাবার্তা তো জানোয়ারের মতোই হবে । তৃনা বিনয়ের সঙ্গে বলল, বাবা নিজের ছেলেকে গালিগালাজ করবেন না । আপনার ছেলে কিন্তু খারাপ মানুষ না । সে একজন ভালোমানুষ । সে যে একজন ভালোমানুষ এই কথাটা সে নিজেও জানে না । জানে না বলেই খারাপ মানুষের মতো আচরণ করে ।
২. মারুফ বাসায় ফিরল রাত সাড়ে বারোটায় । তৃনা বলল, হাত মুখ ধুয়ে এসো । ভাত খাবে । মারুফ হেসে বলল, এখন কয়টা বাজে ? রাত বারোটা পর্যন্ত আমি না খেয়ে থাকবো তোমার তাই মনে হলো ? আমি খেয়ে এসেছি । তৃনা বলল, ও আচ্ছা । মারুফ বলল, বাই দা বাই, তুমি কি আবার আমার জন্যে না খেয়ে বসে আছ নাকি ? তৃনা বলল, হ্যাঁ । মারুফ বলল, এই কাজটা কখনও করবে না । তোমার খিদে পেলেই খেয়ে নেবে । আমি চাই না কেউ আমার জন্যে অপেক্ষা করে থাকুক । তৃনা বলল, আচ্ছা ঠিক আছে । আর কখনও অপেক্ষা করবো না । এখন থেকে খিদে পেলেই খেয়ে নেবো । মারুফ বলল, Thank you very much । তুমি খেয়ে নাও তৃনা । একটা কথা । তোমার নামটা কিন্তু খুব সুন্দর । আমার খুব পছন্দ হয়েছে ।
তৃনা একা একা খাচ্ছে । মারুফ এসে পাশে বসলো । বলল, তোমাকে সঙ্গ দিতে এলাম । একা একা খাচ্ছ দেখতে ভালোলাগছে না । তৃনা বলল, আমাকে সঙ্গ দিতে হবে না । তুমি খুবই ক্লান্ত । ঘরে গিয়ে রেস্ট নাও । মারুফ বলল, আচ্ছা এই যে আমি বাইরে থেকে খেয়ে আসলাম, তুমি আমার জন্যে অপেক্ষা করে করে এখন তোমাকে একা খেতে হচ্ছে তোমার কি এই কারণে আমার উপর অভিমান হচ্ছে না ? তৃনা বলল, না । অভিমান হবে কেন ? বরং আমার তো একা খেতেই ভালোলাগে । মারুফ কথাটাতে একটু বিরক্ত হলো । সে আশা করেছিল তৃনা তাকে বলবে – হ্যাঁ । আমার তোমার উপর খুব অভিমান হয়েছে । এই মেয়েকে যা ভাবা হয়েছে সে সেরকম না । বেশ শক্ত মেয়ে । তার সঙ্গে বুঝে শুনে কথা বলতে হবে । মারুফ বলল, That’s good । That’s very good । আমার ব্যাপারটা আবার উল্টা । আমি একা খেতে পারি না । খাওয়ার সময় দুই একজন পাশে থাকা চাই । তৃনা হেসে বলল, আজও কি দুই একজন পাশে ছিল ? অদিতি কিংবা অন্য কেউ ? মারুফ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করছে যে সে রেগে যাচ্ছে । বলল, তুমি কি আমার সঙ্গে মজা করছ ? এতো সাহস তোমার কী করে হয় ? আমার সঙ্গে আজ কেউ ছিল না । I was all alone while dining । তৃনা বলল, ভাত খাবে ? আমার ধারণা তুমি ক্ষুধার্ত । ক্ষুধার্ত হওয়াতেই ডাইনিং টেবিলে এসে বসেছ । এখন খেলে আর একা খেতে হবে না । আমি তোমার সঙ্গে আছি ।
তৃনা তাকে নিয়ে তামাশা করছে । এই মেয়ে তো সাংঘাতিক । মারুফ বিরক্তি দেখিয়ে বলল, না । ভাত খাবো না । তৃনা বলল, তাহলে বসে থেকো না । ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ো । মারুফের হঠাৎই কোনো কারণ ছাড়া তৃনার উপর খুব রেগে গেলো । সে বলল, আমি বসে থাকলে তোমার অসুবিধা আছে ? তৃনা বলল, অসুবিধা আছে । আমি একা খেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি । প্রাইভেসি বলেও তো একটা কথা আছে । মারুফ আশ্চর্য । বলল, কী বললে ? তৃনা বলল, কেন ? তোমার প্রাইভেসির প্রয়োজন থাকতে পারে, আমার পারে না ?
৩. মারুফ প্রতিদিনই বাইরে থেকে খেয়ে আসে । বাসার খাবার তার ভালোলাগে না । সে অদিতির সঙ্গে সময় কাটায় । বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর এখন আরও বেশি করে অদিতিকে সময় দেয় । আসলে সে এই কাজটা তৃনার উপর ক্ষোভ থেকে করছে । তৃনাকে ধরাশায়ী করাটাই তার উদ্দেশ্য । তৃনা জানবে তার স্বামী অন্য একটা মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত আছে । তৃনার ভেতরে দহন হবে । সে জ্বলে পুড়ে মরবে । মারুফ তো মনে মনে এরকমই দেখতে চাচ্ছে । তৃনা তার কোনো কর্মকাণ্ডেই বাঁধা দিচ্ছে না । মারুফ যাই করুক না কেন তৃনার যেন কিছুই যায় আসে না । এরকম কেন হবে ? ব্যাপারটা কী ? এই মেয়ের কি অন্য কোনো জায়গায় প্রেম ট্রেম আছে নাকি ? কিন্তু প্রেম থাকলেই বা মারুফের কী ? তার জন্যে তো ভালোই ।
মারুফ আজ একটু সকাল সকাল বাসায় এসেছে । এই সকাল সকালটা হলো রাত দশটা । তৃনা বলল, কী ব্যাপার ? আজ এতো আগে আগে ফিরলে যে ? মারুফ উত্তেজিত হয়ে বলল, তাতে তোমার কোনো অসুবিধা আছে ? তৃনা বলল, আরে ? আমার অসুবিধা হতে যাবে কেন ? আমার তো বরং দুশ্চিন্তা হচ্ছে তোমার শরীর ঠিক আছে কিনা এই ভেবে । মারুফ বলল, তোমার মোটেও কোনো দুশ্চিন্তা হচ্ছে না । You are a lier । তোমার মুখে এক আর মনে আরেক । তা না হলে আমি আর্লি বাসায় এসেছি এ নিয়ে তোমার আশ্চর্য হওয়ার কথা না । খুশি হওয়া উচিত ছিল । তৃনা বলল, আমি খুব খুশি হয়েছি । এখন জামাকাপড় ছেড়ে বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো । মারুফ বলল, ঘুমিয়ে পড়বো মানে ? ভাত না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়বো ? তুমি তো সাংঘাতিক মেয়ে । একটা মানুষ সারাদিন পরে বাসায় এসেছে, কোথায় আগে তার খাওয়ার খবর নেবে, তা না, তাকে ঘুমিয়ে পড়ার পরামর্শ দিচ্ছে । তৃনা বলল, তুমি যে খেয়ে আসো নি আমি কী করে জানব ? মারুফ ভয়ানক রেগে গেলো । বলল, জানার কোনো ইচ্ছা আছে তোমার ? আমার ব্যাপারে কী জানো তুমি বলো । কিছুই তো জানো না । জানার কোনো কৌতূহলও নেই । কৌতূহল থাকলে অবশ্যই জানতে যে আমি খালি পেটে ঘুমাতে পারি না । আমি আসলে আমাকে প্রথমেই প্রশ্ন করতে খেয়ে এসেছি কিনা । তৃনা বলল, তোমার ব্যাপারে কৌতূহল দেখানোর তো কথা না । কোনোরকম কৌতূহল প্রদর্শন করা যাবে না, প্রশ্ন করা যাবে না, এই কথাগুলি কার ?
মারুফ চুপ হয়ে গেলো । মেয়েটা হৃদয়হীন । ভালোই হয়েছে । সে নিজে খারাপ, তার বৌ তার চেয়ে এক ডিগ্রি উপরে । খারাপের সঙ্গে খারাপ । ভালো মেয়ে হলেই বরং সমস্যা হতো । মেয়েটার চোখের পানি পড়তো । এই মেয়ের চোখে কোনো জল আছে বলে তো মনেই হয় না । তবে সুন্দর চোখ । এই চোখে জল আসছে দেখলে ভালোলাগত । তৃনা বলল, টেবিলে যাও । টেবিলে ভাত দেওয়া আছে ।
মারুফ সত্য সত্যই একা খেতে পারে না । তৃনা আসার আগে কনা ভাইয়ার সঙ্গে বসতো । মারুফ এখন বিয়ে করে ফেলাতে কনার দায়িত্ব শেষ হয়েছে । কাজেই সে আর আসছে না । এখন তৃনার উচিত মারুফকে সঙ্গ দেওয়া । কিন্তু তৃনাকে যে বলবে মারুফ তা পারছেও না । তার আত্মসম্মানে লাগছে । মারুফ কায়দা করে বলল, তুমিও খেয়ে নাও । খামোখা রাত করে লাভ কী ? মারুফের খুব মন চাচ্ছে তৃনা তার সঙ্গে বসে খাক ।
তৃনা বলল, আমি তো খেয়ে নিয়েছি । মারুফ মন খারাপ করে বলল, ও আচ্ছা । আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার মতোই রাত করে খাও । ভালোই । আমার মতো উশৃঙ্খল জীবনযাপন তুমি কেন করবে ? তুমি তো আর আমার মতো খারাপ মানুষ না । তৃনা ছোট্ট হাসি দিয়ে বলল, তোমার কি আমার উপর খুব রাগ হয়েছে ? আমার উচিত ছিল তোমার জন্যে অপেক্ষা করা । কিন্তু তুমি যে বলেছ তোমার জন্যে যেন বসে না থাকি । খিদে পেলেই যেন খেয়ে নিই । আমার আজ খুব খিদে পেয়েছিলো । মারুফ বলল, আমি কী কী বলেছি আমার সব মনে আছে । এই কথাগুলি আমাকে প্রতিদিন স্মরণ করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই । আসলে তুমি মানুষ হিসাবে খুব খারাপ । আমার চেয়েও অনেক খারাপ । ভালো মানুষের মুখোশ ধরে বসে থাকো । তৃনা বলল, হ্যাঁ আমি অনেক খারাপ । খারাপ হওয়াতেই আমি ভালো আছি । আমি ভালোমানুষ হলে আমার কী অবস্থা হতো একবার ভেবে দেখেছ ? আমাকে হয়তো বিয়ের রাতেই সুইসাইড করতে হতো । মারুফ একেবারে চুপ হয়ে গেছে । তৃনা বলল, ভাত খেয়ে আসো ।
মারুফ একা একা খাচ্ছে । সে খুব আশা করে আছে তৃনা আসবে । এসে পাশে বসবে । মারুফ যে একা খেতে পারে না এই খবর সে তৃনাকে জানিয়েছে । তৃনার কি একবার আসা উচিত না ? মারুফের খুবই অস্থির লাগছে । অস্থিরতার কারণে সে ভাতটা খেতে পারলো না । ভাত রেখে উঠে গেলো । তৃনাকে কীভাবে যন্ত্রণা দেওয়া যায় এই চিন্তা এখন তার মাথায় ।
তৃনা বিছানায় বসে টিভি দেখছে । মন মেজাজ বেশ ভালো । মারুফ এসে বিছানায় বসলো । তৃনা বলল, চলে এলে যে ? তুমি খাও নি ? মারুফ বলল, খাবো না কেন ? তৃনা বলল, এতো তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ ? জ্বীনেরাও তো এর চেয়ে সময় নিয়ে খায় । মারুফ বলল, আমি তাড়াতাড়িই খাই । খাওয়ার টেবিলে সময় নষ্ট করতে ভালোলাগছিল না । মনটা খুবই অস্থির হয়ে আছে । অদিতি মেয়েটা আজ খুব বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে । তৃনা বলল, কী করেছে ? মারুফ বলল, আমার বুকে মাথা রেখে অনেকক্ষণ কাঁদল । আমি বিয়ে করে ফেলেছি এই ব্যাপারটা সে মানতেই পারছে না । আমি তাকে বললাম – অদিতি এই বিয়েটা জাস্ট একটা ফান । বাবা মার মুখ রক্ষা করার জন্যে বিয়ে করা । আমার বউয়ের নামটাই তো আমি ঠিকমতো জানি না । একে কি তুমি বিয়ে বলবে ? কিন্তু এই জেদি মেয়েকে বোঝায় এমন সাধ্য কার ? সে আমাকে ছাড়বেই না । বুকের সঙ্গে চেপে ধরে বলল, তোমাকে কোথাও যেতে দেবো না ।
তৃনার যতটা আহত হওয়ার কথা ততটা আহত সে হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না । সে বেশ সহজ ভঙ্গিতে বলল, তোমার তাকে ফেলে চলে আসা উচিত হয় নি । তোমার উচিত ছিল আরও কিছুক্ষণ তার সঙ্গে থাকা । বাসায় তো বেকার বসে থাকো । এই সময়টা মেয়েটাকে দিলে পারতে । সে তোমাকে ভালোবাসে । তুমিও বাসো । কাজেই তার তোমার উপর দাবি আছে । মারুফ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে । তার ভেতরে ভয়াবহ যন্ত্রণা হচ্ছে । এই জীবনে সে অনেক মেয়েমানুষ দেখেছে কিন্তু নিজের স্বামীকে নিয়ে এই জাতীয় মন্তব্য করতে পারে এরকম বউ এই প্রথম দেখল । মারুফের ফোন বাজছে । অদিতি ফোন করেছে । অদিতির নম্বর দেখে মারুফের গলা শুকিয়ে গেছে । সে ফোন ধরছে না । তৃনা বলল, ফোন ধরছ না কেন ? ফোন ধরো । আর যদি সৎ সাহস থাকে ফোনটা স্পীকারে দাও । মারুফ ফোন ধরে স্পীকারে দিলো । অদিতি বলছে – তুমি আজ আসলে না যে ? সারা সন্ধ্যা আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করলাম । অপেক্ষা করে করে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত দশটা । অথচ তোমার কোনো দেখা নেই । মোবাইলটাও বন্ধ রেখেছ । যাতে আমি তোমাকে ফোনে রিচ করতে না পারি । আমার সঙ্গে এরকম কেন করলে ? মারুফের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে । সে তৃনার দিকে তাকিয়ে আছে । মারুফের মুখটা দেখে তৃনার এই মুহূর্তে খুব মায়া হচ্ছে । তৃনা বলল, কোনো ব্যাপার না । আমি কিছু মনে করি নি । মানুষ ফেরেশতা না । সে মিথ্যা বলবে এটাই স্বাভাবিক । মারুফ সামান্য মুগ্ধ হয়েছে । বিয়ের রাতে সে তৃনাকে অহংকার করে বলেছিল সে কখনও মিথ্যা বলে না । তৃনা চাইলেই সেই কথা তুলে তাকে লজ্জা দিতে পারতো । কিন্তু সে তা করলো না । মেয়েটাকে যত খারাপ ভাবা হয়েছে আসলে ততটা খারাপ সে না । কিছু ভালো দিক তার মধ্যেও আছে । তৃনা বলল, তোমরা কথা বলো । আমি পাশের ঘরে যাচ্ছি । মারুফ বলল, না তুমি কোথাও যাবে না । সে তৃনার হাত চেপে ধরল । আশ্চর্য নরম হাত মেয়েটার । আহা ! এই হাত সে এতদিন কেন ধরে নি ? মারুফ তৃনাকে বলল, এতো কীসের অহংকার তোমার ? তৃনা বলল, মেয়েটা লাইনে আছে । আজেবাজে কথা বলবে না । সে শুনতে পাবে । মারুফ ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে বলল, শুনলে শুনুক । সে এতো রাতে কেন ফোন করবে ? আমার কোনো পার্সোনাল লাইফ থাকতে পারে না ? তৃনা বলল, হাত ছাড়ো । মেয়েটা এখনও লাইনে আছে । তার সঙ্গে কথা শেষ করো । মারুফ তৃনার হাত ছেড়ে দিলো ।
মারুফ অদিতির ফোন কেটে দিয়েছে । তার এতো অশান্তি লাগছে । তৃনা এভাবে ঘর থেকে চলে গেলো । আবার কখন আসে কে জানে । মেয়েটাকে এক মুহূর্ত চোখের সামনে না দেখলে ভালোলাগে না ।
৪. তৃনা হলুদ রঙের শাড়ি পরেছে । হলুদ মারুফের অতি অপছন্দের রঙ । তৃনা নিশ্চয়ই কোনোভাবে এই তথ্য জানতে পেরেছে এবং বেছে বেছে মারুফের অপছন্দের রঙটাই নির্বাচন করলো । তাকে উত্তেজিত করাটাই আসলে এই মেয়ের উদ্দেশ্য । কিন্তু এই মুহূর্তে মারুফ যে এই কারণেই উত্তেজিত হচ্ছে তা না । তার রাগের অন্য কারণ ঘটেছে । হলুদ শাড়িতে তৃনাকে ভালোলাগছে । শুধু ভালোলাগছে বললে অনেক বড় মিথ্যা বলা হবে । তৃনাকে দেখতে দুর্দান্ত লাগছে । কিন্তু কেন দুর্দান্ত লাগবে ? কী আশ্চর্য ! আর এই ফালতু রঙটাই বা এখন মারুফের চোখে এতো সুন্দর হয়ে দেখা দিচ্ছে কেন ? না । এই বিভ্রান্তি বাড়তে দেওয়া যাবে না । তাকে তৃনাকে শাড়ি বদলাতে বাধ্য করতে হবে । মারুফ তৃনাকে বলল, তৃনা তোমার কি ধারণা তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে ? তোমাকে দেখতে অতি বিশ্রী লাগছে । হলুদ রঙের শাড়ি কেউ পরে নাকি ? আমার সামনে আর কখনও হলুদ শাড়ি পরে আসবে না । এই রঙ আমি একদম পছন্দ করি না । তৃনা হাসছে । বলল, তাই নাকি ? সত্য সত্যই বিশ্রী লাগছে ? তাহলে তো শাড়ি বদলে ফেলতে হয় । মারুফ বলল, অবশ্যই বদলে ফেলবে । এই মুহূর্তে এখানে দাঁড়িয়ে বদলে ফেলবে । ইফ নেসেসারি আমি চোখ বন্ধ রাখব । তৃনার এত হাসি পাচ্ছে । সে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে । শাড়ি বদলে আসছি । তৃনা শাড়ি বদলাতে যাচ্ছে এমন সময় মারুফ বলল, না থাক । তোমার ভালোলাগলে পরে থাকো । আমি কারো ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চাই না । তৃনা কাছে এসে একটা অর্থবোধক হাসি দিয়ে বলল, তোমার যে নিজের বউটাকে দেখতে ভালোলাগছে এই কথাটা মুখ ফুটে বলতে অসুবিধা কোথায় ? সবসময়েই বউয়ের কাছে ভিলেন সেজে থাকতে হবে ? এতে কী লাভ ? তুমি তো ভিলেন না । তুমি একজন ভালো মানুষ । You are a good soul । তুমি যে একজন ভালো মানুষ এই খবর কি তোমার কাছে আছে ? মারুফ বলল, আমি ভালো মানুষ কী করে বুঝলে ? তৃনা বলল, তুমি নিজেকে আমার কাছে খারাপ মানুষ হিসাবে উপস্থাপন করছ । কোনো খারাপ মানুষই এই কাজটা করবে না । উল্টোটা করবে । এই যে তুমি আমার চোখে নিজেকে একজন মন্দ মানুষ বানিয়ে রেখেছ এর পেছনের সত্যটা কী জানো ? সত্যটা হলো তুমি আমার চোখে ভালোবাসা দেখতে চেয়েছ । What evils you are doing are all for love । মারুফ অদ্ভুত সুন্দর চোখে তাকিয়ে আছে । এই দৃষ্টি মুগ্ধতার দৃষ্টি । তাকে কেউ কোনোদিন ভালো বলে নি । এমনকি সে নিজেও না । তৃনাই প্রথম মানুষ যে তার মধ্যে ভালো কিছু দেখতে পেলো । এই মেয়েকে ভালো না বেসে থাকা যায় ? তৃনা বলল, এভাবে তাকিয়ে থাকবে না । আমার অস্বস্তি হয় । মারুফ বলল, তৃনা তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে । তৃনা বলল, আমি সুন্দর তাই সুন্দর লাগছে । কিন্তু আমার ধারণা তুমি আরও কিছু বলতে চাচ্ছ । যে কোনো কারণেই হোক এই মুহূর্তে বলতে পারছ না । আমি কি তোমাকে সাহায্য করতে পারি ? মারুফ বলল, না পারো না । আমার কথা আমাকেই বলতে দাও । তৃনা, Something strange has happened to me. I am in love with you । তৃনা চোখ বড় বড় করে বলল, আর অদিতি ? মারুফ বলল, অদিতিকে আমি ভালোবাসার চেষ্টা করেছি । কিন্তু পারি নি । তোমাকেও ঘৃণা করার অনেক চেষ্টা করলাম । তাও পারলাম না ।
তোমার চোখে দেখেছিলাম
কাজী ইনাম