শিশির বিন্দু পর্ব- ৭

“শিশির বিন্দু”
পর্ব- ৭
(নূর নাফিসা)
.
.
– শিশিরবিন্দু! খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে এখন তোমাকে! সারপ্রাইজড দিতে এসে তো উল্টো আমি নিজেই সকড! কতো বড় চাপানো স্বভাবের তোমারা ভাবতে পারছো! আমি বাবা হবো অথচ একটা লোক আমাকে জানায়নি খবরটা! তুমি না হয় অভিমানে ছিলে, কিন্তু বাকিরা!
– জানে না তো কেউ!
– জানাওনি কাউকে !
– উহুম।
– মা কে ও না?
– কাউকে না।
– কেন?
– সবার আগে তো বেবির বাবার জানার অধিকার ।
– তুমি জানো, বাবা মা এখন জানলে কতটা খুশি হবে! এমনকি এখন বিয়ে বাড়িতে নতুন আমেজে মেতে উঠবে সবাই!
বিন্দু শিশিরের ব্লেজার টেনে বললো,
– ইশ! এখন বলবে না কাউকে!
– কতক্ষণ চাপা রাখবে!
– যতক্ষন রাখা যায়।
শিশির হুট করেই তাকে কোলে উঠিয়ে বললো,
– বেবিদের বাবা যে এতো বড় আনন্দ চাপা রাখবে না! শিশিরবিন্দু! আমি ভাবতে পারছি না তুমি সবার কাছে লুকিয়ে রেখেছো কিভাবে! মা কি কিছুই বুঝতে পারেনি!
– আমিই তো জানলাম মাত্র তিনদিন আগে।
শিশির তাকে খাটে বসিয়ে দিয়ে জুতা খুলতে লাগলে বিন্দু নিষেধ করলো। শিশির শুনলো না। সে জুতা খুলতে খুলতে বললো,
– আমি যদি আজ না আসতাম তাহলে কি ফোনে জানাতে আমাকে?
– উহু!
– কতদিন লুকিয়ে থাকতে? এক সময় তো সবাই জেনেই যেতো আর আমাকেও জানিয়ে দিতো! ভাগ্যিস আজ এসেছিলাম! তা না হলে তো আমার লাইফের সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজটা আমি মিস করে ফেলতাম! যা হয় ভালোর জন্যই হয়!
শিশির নিজের জুতা খুলেও বিন্দুকে শুয়িয়ে কম্বল টেনে দিলো। বিন্দু বললো,
– আমি এখনই ঘুমাবো?
শিশিরও কম্বলের নিচে শুয়ে বললো,
– উহুম, আমরা ঘুমাবো এখন।
– খাবে না!
– এখানে এসে আলু খেয়েছি। এখন মিষ্টি খাবো।
– কি!
শিশির ঠোঁটের কোনায় দুষ্টুমি হাসি ফুটিয়ে বললো,
– মিষ্টি চেনো না?
কথাটা বলেই কম্বল একটানে সরিয়ে পেটে গভীরভাবে চুমু খেয়ে আবার কম্বল টেনে শুয়ে বললো,
– চিনতে পেরেছো?
বিন্দু লজ্জায় তার ব্লেজারের ভেতর মুখ লুকিয়ে নিয়ে বললো,
– মিষ্টির কথা না তো, আলুর কথা শুনে আশ্চর্য হলাম!
– আসার পরপরই মামি বিরিয়ানির প্লেট দিয়েছে। তোমার সাথে গান গাইবো তাই খাওয়ার এতো সময় ছিলো না। পেটে ক্ষুধা থাকায় শুধু আলুর টুকরোগুলো বেছে খেয়েছি।
বিন্দু তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
– কখন এসেছো তুমি?
– তুমি গান গাওয়ার দশ মিনিট আগে। এসেই শুনলাম তুমি নাকি গান গাইবে, তাই আর সামনে যাই নি। একেবারে মঞ্চে উঠেই দেখা দিলাম সবাইকে।
– এয়ারপোর্ট থেকে সোজা এখানে চলে এসেছো?
– ঢাকা এসেছি আমি সকালে। কাউকে জানাইনি সারপ্রাইজ দিবো বলে। নিজের বাড়িতে তালা ঝুলছে বিদায় এয়ারপোর্ট থেকে ডিরেক্টলি শ্বশুরবাড়ি চলে গেলাম। আসবাবপত্র সেখানে রেখে বিভোর ভাইয়ার সাথে একটু সময় কাটিয়ে দুপুরের দিকে এখানে আসার জন্য রওনা দিয়েছি।
– চোখটা কিছু সময়ের জন্য বন্ধ করবে?
– শিশিরবিন্দু, আর কত! আমি তো সেই দিনের আশায় আছি যেদিন, চোখে চোখ রেখে দেখবে আমাকে, মনে মন ছুয়ে কথা বলবে, সুরে সুর মিলিয়ে গান গাইবে, পায়ে পা রেখে দাঁড়াবে, হাতে হাত রেখে পথ চলবে। এখন তো বেবিরাও আসতে চলেছে। কবে পূরণ হবে আমার সেই প্রত্যাশা!
শিশির কথা বলছে আর বিন্দু তাকিয়ে আছে তার ঘনঘন নাড়ানো ঠোঁটে। শিশির এগিয়ে তার নাকে নাক লাগিয়ে মুখের কাছে মুখ এনে বললো,
– শিশিরবিন্দু, তুমি কি জানো বেবিদের আগমনীতে তুমি কতটা চেঞ্জ হয়ে গেছো?
– যেমন?
– আগের চেয়ে মোটা হয়েছো একটু! এখন পারফেক্ট লাগছে তোমাকে।
– আমি কি একটু দেখার সুযোগ পাবো না!
– আগে তো আমি দেখবো! বায়াত্তর দিন আমি তোমাকে দেখিনি! পরোক্ষভাবেও সুযোগ দাওনি আমাকে!
– আমি তো তিয়াত্তরদিন দেখিনি! তাও সেটা বেবিদের বাবার জন্য!
বলতে বলতে বিন্দুর চোখের দু’ধারে দুই ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো! শিশির তার ওষ্ঠ দ্বারা শুষে নিয়ে তাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো। বিন্দু প্রাণভরে দেখছে তাকে! মাথা ও সমস্ত মুখে হাত বুলাচ্ছে। কিন্তু একটুও তৃপ্তি মিটছে না তাকে দেখার! কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর শীতুলের হাক পড়লো,
“ভাবি! ভাইয়া এখানে? আসি আসি বলে তো আর এলে না! প্রোগ্রাম শেষ! দরজা খুলো!”
শিশির লাফ দিয়ে বসে পড়লো। বিন্দু তাকে আচমকা উঠতে দেখে বললো,
– কি হয়েছে?
– আমি তো ভাবলাম শীতুল বুঝি রুমের ভেতরে!
বিন্দু হেসে উঠে বসলো। শিশির বললো,
– শীতুল, সমস্যা কি তোর!
– দরজা খুলো! আমি ভেতরে আসবো।
– কেন?
– আমার জামাকাপড় এখানে, চেঞ্জ করবো। রাত অনেক হয়েছে ঘুমাবো। মামি তোমাকে খুজছে, খাওয়ার জন্য। আরও কারণ লাগবে!
– তার আগে, মা কে একটা খবর দিয়ে আয়।
– পারবো না। দরজা খুলো, আমার ঘুম পেয়েছে খুব!
– শীতুল, আমাদের ঘরে নতুন অতিথি আসছে, তুই ফুপি হবি!
– কিইইই! মায়ায়ায়া!
শীতুল মা কে ডেকে দৌড়ে চলে গেলো। বিন্দু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শিশিরের দিকে! শিশির হাসতে হাসতে শুয়ে পড়লো! বিন্দু অসহায় ভঙ্গিতে বললো,
– এখন না জানালে চলতো না!
শিশির বিন্দুকে টেনে তার কাছে এনে বললো,
– আগেই তো বলেছি, বেবিদের বাবা আনন্দ চাপা রাখবে না! তাছাড়া দেরি করলে আবার অপরাধ হয়ে যাবে।
– আমার যে এখন কেমন কেমন লাগছে!
– হেই, টেনশন করবে না একদম! বি ইজি। হুম। খুশির সময় টেনশন করতে নেই। সবসময় হাসিখুশি থাকবে। ওঠো ওঠো।
বিন্দুকে উঠিয়ে শিশির সব গোছগাছ করে দরজা খুলে রাখলো। শিশির হাটে হাড়ি ভাঙায় জনগণের সমাগম বেড়ে গেছে! আফসানা ফেরদৌসি আসতেই শিশির বললো, “মা, বিন্দু কিন্তু নার্ভাস ফিল করছে!”
– নার্ভাস কেন ফিল করবে! খুশির খবর এনে নার্ভাস হয় কেউ! আমি তো একের পর এক সারপ্রাইজ পেয়ে আত্মহারা হয়ে যাচ্ছি! তোর বাবাকে এবার মিষ্টির ফেরি নিয়ে বসতে বলবো! দেখি আমার মেয়েটাকে!
কথাটা বলে বিন্দুর মাথায় চুম্বন করলেন তিনি! এরপর এলো শিশিরের নানু, শিশিরের মামীরা। বিন্দুকে স্বাভাবিক রাখতে আফসানা ফেরদৌসি সামলে নিলেন এদিকটা। অবশেষে শিশিরের কথাই সত্য হলো! বিয়ে বাড়িতে নতুন অতিথির আগমনেরও আমেজ ছড়িয়ে গেলো! প্রথমবার বাবা হতে যাচ্ছে শিশির, সেই আমেজে তার কাজিনরা তাকে ঠেলে ধাক্কিয়ে চার প্লেট বিরিয়ানি খায়িয়ে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে! সাথে ঝড় গেছে মামাতো বোন সায়মার উপর! কাল তার বিয়ে। বিয়ের দিন তো খেতে পারবে না। তার কাজিনদের মতে, বিয়ে তো একবারই হবে তাই ইচ্ছে মতো বিয়ের খাবার খেয়ে নিক! যাতে আজীবন মনে রাখে বিয়ের কথা! তার বিয়ে উপলক্ষে টুকটাক খাওয়াদাওয়ার পরও তাকেই জোর করে পুরো এক প্লেট বিরিয়ানি খায়িয়ে ছেড়েছে! ফলস্বরূপ সায়মার উক্তি, আগামী সাতদিন তার না খেলেও চলবে! বিয়ে বাড়ির সব মজা সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছে তারা এই মধ্যরাতে! বিন্দু শিশিরের চিন্তায় অস্থির! আজ দেশে এসেছে, অর্থাৎ সে দুদিন ধরে বিশ্রাম থেকে দূরে ! এতো রাত হয়ে গেছে তাও কাজিনদের হাত থেকে মুক্তি নেই! শিশির বিন্দুর অস্থিরতা বুঝতে পেরে যত তারাতাড়ি সম্ভব সবার আমেজের অবসান ঘটিয়ে সবাইকেই ঘুমানোর জন্য পাঠিয়ে দিলো। সে বিন্দুকে নিয়ে তাদের জন্য আলাদা রুম নিয়ে নিয়েছে। আর বাকিরা ঠেসাঠেসি অন্যান্য রুমে!
বিয়ের দিনক্ষণ তাদের আনন্দেই কেটেছে। শিশির উপস্থিত থাকায় আনন্দটা আরও বেশি জমে গেছে! সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হয়েছে বিন্দু। তার শূন্যতা কেটে গেছে শিশিরকে পেয়ে। ধুমধামে বিয়ে সম্পন্ন হলো। অনেক মেহমান চলে গেছে কিন্তু শিশিররা রয়ে গেছে। শীতকালীন ছুটিতে তারা বহুদিন পর বেড়ানোর সুযোগ পেয়েছে তাই আরও এক সপ্তাহের মতো এখানে কাটিয়ে তারপর বাড়ি ফিরবে। বিয়ের দুদিন পর খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে শিশির বিন্দু নামাজ আদায় করে ঘুরতে বের হলো। শিশিরের কথায় বিন্দু শাড়ি পড়েছে। শীত এতোটা না থাকলেও শিশির তাকে শীতের পোশাক পরিয়ে তারপর বেরিয়েছে। বিন্দু সেই পথ দেখালো যেই পথে সায়মার বিয়ের আগের দিন সকালে এসেছে। শিশির সেই পথেই হাটতে লাগলো বিন্দুর হাত ধরে। হাটতে হাটতে শিশির বললো,
– শিশিরবিন্দু, ইতালি থেকে আমি কি এনেছি তা তো একবারও জানতে চাইলে না তুমি!
– তুমি এসেছো এতেই আমার চাওয়া পূরণ হয়ে গেছে।
শিশির তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে হাটতে হাটতে বললো,
– সাথে যে আরও কিছু এনেছি।
– শিশিরবিন্দুকে জানাতে ইচ্ছে হলে বলো।
– অন্যদেরটা বাদে বলি। তোমার জন্য দুইটা ড্রেস এনেছি। আর বেবিদের জন্য এক জোড়া জামা, দুই জোড়া জুতো, এক জোড়া দোলনা, একজোড়া মামপট, এক জোড়া…
শিশিরকে থামিয়ে দিয়ে বিন্দু অবাক হয়ে বললো,
– বেবিদের কথা জেনেছো এখানে এসে। তাহলে এসব!
– প্লানিং করে আসছিলাম তো! যখন বেবিরা আসবে তখন যদি শুনে তাদের বাবা ইতালি ছিলো অথচ তাদের জন্য সেখান থেকে কিছু নিয়ে আসেনি। তাহলে কি মন খারাপ করবে না! তাই আগেই নিয়ে এলাম। আপাতত দুজনের জন্য নিয়ে এলাম নেক্সট টাইম যখন আরও অতিথি আনবো তখন না হয় আবার সেখানে গিয়ে হানিমুন সেড়ে আসবো! কি বলো?
বিন্দু অন্যদিকে ফিরে হাসলো। শিশির লজ্জামাখা কথা বলতে বলতে পথ অতিক্রম করে সেই মাঠে এলো। শীতের সকাল হওয়ায় পুরো মাঠ ফাকা! বিন্দু শিশিরের সাথে জুতা হাতে নিয়ে শিশির ভেজা ঘাসের উপর খালি পায়ে হাটলো। খুব ভালো লাগছে দুজনেরই! মাঝপথে বিন্দু শিশিরকে থামিয়ে দিয়ে সামনে এসে দাড়ালো। হাত থেকে জুতা ফেলে শিশিরের দুই কাধে দুহাত রেখে চোখে চোখ রেখে বিন্দু বললো,
– জনাব, আজ আমি তোমার প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম। চোখে চোখ রেখে দেখছি, মন থেকে উচ্চারণ করছি, আমি পায়ে পা রেখে দাড়াবো!
সাথে সাথেই শিশিরের হাত থেকেও জুতা পড়ে গেলো! মুখে ফুটে উঠলো ভুবন জয়ী হাসি! বিন্দু তার শিশির ভেজা চরণ প্রিয় মানুষের চরণে রাখলো। শিশির তাকে দু’হাতে ধরে দাড়াতে সাহায্য করলো। বিন্দু এখন পায়ে পা রেখে দাড়িয়ে দু’হাতে গলা জড়িয়ে অতৃপ্ত প্রাণভরে দেখছে তাকে! চোখ দুটো তার ছলছল করছে! শিশির বিন্দুর দিকে পলকহীন দৃষ্টি রেখে বললো,
“করিলে পূরণ বহুদিনের শখ,
ভুবনে নেই আজ দুঃখের কলরব!
আছে শুধুই পক্ষীকূলের গুঞ্জন।
ভেজা চরণের স্পর্শে জাগালে শিহরণ!
জমা ছিলো যত, শত শত আলাপন!
প্রকাশ হলো তাহা মনে মনকথন!
সবুজের বুকে জমেছে যে শিশিরবিন্দু
তিলে তিলে সঞ্চিত করলে তা, সৃষ্টি হবে সিন্ধু!”
বিন্দু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে! উক্তি শেষ করে শিশির তার কপালে ভালোবাসার স্পর্শ একে দিলো। বিন্দু তাকে ছেড়ে দিয়ে একটু সামনে এগিয়ে গেলো। ঘাসে স্পর্শ করে হাতে শিশিরবিন্দু কণা নিয়ে সেখান থেকেই চেচিয়ে বললো,
” জনাব, দেখো তুমি-আমি জমে গেছি সবুজের বুকে। সোনালী কিরণে মিশে যাবো আবার প্রকৃতির আড়ালে ! হয়তোবা জাগ্রত হবো আবারও নতুন কোনো ভোরে!”
শিশির এগিয়ে এসে তার শিশিরভেজা হাত মুঠোয় ধরে চুম্বন করলো। অত:পর সামনে কদম ফেলতে লাগলো৷ যেন কিরণ হয়ে তারা নেমে এসেছে ভুবনে! কদমে কদমে শিশির বিন্দু মুছে নিয়ে নতুনত্ব দান করছে সবুজতৃণমূলকে! তালে তাল মিলিয়ে প্রভাত কিরণ ন্যায় শিশিরবিন্দু ভুবনে ছড়িয়ে যাচ্ছে এক নয়া প্রেম ও ভালোবাসার আলোড়ন!
.
(সমাপ্ত)
.
.
গল্পটাতে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য বিদ্যমান ছিলো না। শুধুমাত্র “তৃ-তনয়া” র সাথে বোনাস স্বরূপ ক্ষুদ্র একটা প্রেম কাহিনী উপস্থাপন করতে চেয়েছিলাম। কেমন লাগলো উপহারটা?