মা আমাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলেন।
আমি তাকে আটকাইনি।
তিনি এখনও আমার মা।
কিন্তু যখন তিনি বলতে শুরু করলেন,
— তোর বোনের তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বাবা…
আমি হাত তুলে থামালাম।
শান্ত গলায় বললাম,
— মা, আগে একটা জিনিস দেখো।
ফোনটা তার হাতে দিলাম।
একটার পর একটা ছবি দেখালাম।
বাড়ির সামনে ভাঙা ডিম।
ছড়িয়ে পড়া দুধ।
আমার ফুলে ওঠা পা।
হাসপাতালের রিপোর্ট।
আর সেই দিনের তানিয়ার মেসেজ—
“ফেরার সময় ডিটারজেন্ট নিয়ে আসবা।”
মা ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়লেন।
তারপর ফিসফিস করে বললেন,
— তানিয়া…
তানিয়া আবার কান্না শুরু করল।
— আমি খুব ক্লান্ত ছিলাম মা… রিফাত বলেছিল ভাইয়া সবসময় নিজেকে অসহায় দেখাতে চায়…
মা এবার রিফাতের দিকে তাকালেন।
রিফাত কাঁধ ঝাঁকাল।
— আমি তো সত্যিই তাই ভাবতাম।
আমি হেসে ফেললাম।
তবে সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না।
— কী মনে করো? আমি নিজের বাড়িতে থাকি, এটা মনে করিয়ে দেওয়া অপরাধ?
মা চোখ বন্ধ করলেন।
কয়েক সেকেন্ড পর আবার খুললেন।
তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেছে।
তিনি তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তোর ভাই ঠিক করেছে। ত্রিশ দিনের মধ্যেই তোদের চলে যেতে হবে।
তানিয়া হতবাক হয়ে গেল।
— কী?
মা কঠিন গলায় বললেন,
— আমি তোকে অন্য বাসা খুঁজতে সাহায্য করব। দরকার হলে রিদম কিছুদিন আমার কাছে থাকবে। কিন্তু যে ছেলেকে বৃষ্টির মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছে, তাকে আমি আর চাপ দেব না।
রিফাত বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল।
— বাহ! এখন দেখি সবাই আমার বিপক্ষে।
মা ঠান্ডা গলায় বললেন,
— না। সবাই তোর বিপক্ষে না। সবাই অন্যায়ের বিপক্ষে।
সেদিন থেকেই সবকিছু বদলাতে শুরু করল।
তৃতীয় দিন রিফাত বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
বলে গেল, কাজ খুঁজবে।
পরদিন গভীর রাতে ফিরল।
গা থেকে মদের গন্ধ আসছিল।
নতুন একটা চাকরির গল্প বলল।
কেউ বিশ্বাস করল না।
সেই রাতেই তাদের ঘর থেকে ঝগড়ার শব্দ ভেসে এলো।
উঁচু গলায় কথা।
অভিযোগ।
দোষারোপ।
কান্না।
রিদম চুপচাপ বেরিয়ে এসে আমার পাশে বসেছিল।
আমরা দুজন টিভিতে খবর দেখছিলাম।
হঠাৎ সে বলল,
— মামা… আমি দুঃখিত।
আমি তাকালাম।
— আগেও তো বলেছো।
সে মাথা নাড়ল।
— না। এবার অন্য কারণে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আমি এখানে এতদিন ছিলাম… কিন্তু কখনও ভাবিনি এই বাড়িটা তোমার কত কষ্টের।
আমার গলায় শব্দ আটকে গেল।
আমি শুধু মাথা নাড়লাম।
বাইশ দিন পর তানিয়া একটা ছোট বাসা পেল।
বাজারের কাছেই।
খুব সুন্দর না।
দেয়ালে পুরোনো রং।
রান্নাঘর ছোট।
কিন্তু সেটা ছিল তার নিজের ভাড়া করা বাসা।
অন্য কারও দয়ার উপর দাঁড়িয়ে থাকা ছাদ না।
মা তাকে অগ্রিম টাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।
আমি করিনি।
আমি শুধু বলেছিলাম,
— চুক্তি অনুযায়ী চাবি বুঝিয়ে দিলে মালপত্র নেওয়ার গাড়ির ভাড়া আমি দেব।
তানিয়া রাজি হয়ে গেল।
রিফাত রাজি হলো না।
— আমি কোনো কাগজে সই করব না।
আমার আইনজীবী বন্ধু নওরীন হালকা হেসে বলল,
— তাহলে পরে আদালতে সই করবেন।
শেষ পর্যন্ত সে সই করেছিল।
যেদিন তারা চলে গেল, সেদিনও আকাশে হালকা বৃষ্টি ছিল।
তবে সেই রাতের মতো ঝড়ো না।
নরম।
শান্ত।
তানিয়া টেবিলের উপর বাড়ির চাবি রেখে দিল।
তার চোখ দুটো ফুলে ছিল।
সে অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— আমি সত্যিই তোমার সুযোগ নিয়েছি।
আমি চুপচাপ তাকিয়ে রইলাম।
কোনো অজুহাতের অপেক্ষা করছিলাম।
কিন্তু সে অজুহাত দিল না।
শুধু বলল,
— আমি ভয় পেয়েছিলাম। কিছু হারানোর ভয়। তারপর ধীরে ধীরে ভাবতে শুরু করলাম, তোমার যা আছে, সেগুলোর উপর আমারও অধিকার আছে।
আমার বুকটা ভারী হয়ে গেল।
— আমি তোমাকে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম, তানিয়া।
সে মাথা নিচু করল।
— জানি।
— কিন্তু তুমি আমাকে দায়িত্ব ভেবেছিলে।
তার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল।
— জানি।
রিদম বের হওয়ার আগে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
— আমি কি মাঝে মাঝে আসতে পারব?
আমি তানিয়ার দিকে তাকালাম।
সে মাথা নিচু করল।
— যদি তোমার মামা চায়।
আমি রিদমের কাঁধে হাত রাখলাম।
— অবশ্যই আসবে। তবে দরজায় নক করবে। আর যে কাপটায় চা খাবে, সেটা নিজে ধুয়ে রাখবে।
সে হেসে ফেলল।
— ঠিক আছে।
রিফাত বিদায়ও বলেনি।
চুপচাপ বের হয়ে যাচ্ছিল।
হাতে একটা টিভি মনিটর।
যেটা তার ছিল না।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আবু কাকা গলা খাঁকারি দিলেন।
— ওটা রেখে যান।
রিফাত থমকে গেল।
তার মুখ লাল হয়ে উঠল।
এক মুহূর্ত পর মনিটরটা নিচে নামিয়ে রেখে বেরিয়ে গেল।
আমি তাকিয়ে রইলাম।
হয়তো এটাই ছিল এই বাড়ির শেষ শিক্ষা।
যে মানুষ অন্যের জিনিসকে নিজের মনে করে, সে শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই চলে যায়।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর বাড়িটা ভীষণ নীরব হয়ে গেল।
প্রথমে সেই নীরবতা ভালো লাগেনি।
অস্বস্তিকর লাগছিল।
ড্রয়িংরুমের দেয়ালে দাগ।
বসে যাওয়া কুশন।
পুরোনো খাবারের গন্ধ।
অগোছালো অতিথি কক্ষ।
প্রায় খালি স্টোররুম।
তবুও…
এই বাড়িটা আবার আমার হয়ে উঠছিল।
আমি সোফায় বসে পা উঁচু করে রাখলাম।
আবু কাকা দুই বোতল ঠান্ডা পানীয় নিয়ে এলেন।
একটা আমার হাতে দিয়ে বললেন,
— তোমার বাড়ির জন্য।
আমি বোতলটা তার বোতলের সঙ্গে ঠুকিয়ে বললাম,
— আর আমার সেই কুখ্যাত সিঁড়িটার জন্য।
আমরা দুজনেই হেসে উঠলাম।
অনেকদিন পর হাসতে গিয়ে বুকটা আর কেঁপে ওঠেনি।
সময় ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
আমার পা ভালো হলো।
একদম আগের মতো না।
তবুও অনেকটাই।
বাড়ির সামনে ভাঙা সিঁড়িটা ঠিক করালাম।
মোশন সেন্সর লাইট লাগালাম।
পিচ্ছিল রোধ করার ম্যাট বিছালাম।
মূল দরজার তালা বদলে ফেললাম।
অতিথি কক্ষটাকে সাদা রঙ করে ছোট্ট একটা অফিস বানালাম।
এক রবিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের জন্য কফি বানালাম।
চারপাশে কোনো চিৎকার নেই।
কোনো টিভির শব্দ নেই।
কেউ জিজ্ঞেস করছে না—
“রুটি আছে?”
আমি জানালা খুললাম।
ভেজা মাটির গন্ধ ভেতরে ঢুকে পড়ল।
দূরে রুটিওয়ালার হাঁক ভেসে এলো।
কফির মগ হাতে দাঁড়িয়ে রইলাম।
নিজের বাড়িতে।
নিজের শান্তির মধ্যে।
আর কাঁদলাম।
যেদিন বাড়ির কাগজে সই করেছিলাম, সেদিনও কেঁদেছিলাম।
আজও কাঁদলাম।
তবে কারণটা আলাদা।
সেদিন একটা বাড়ি পেয়েছিলাম।
আজ নিজেকে ফিরে পেয়েছি।
তিন মাস পর তানিয়া আবার এলো।
একা।
হাতে একটা ব্যাগ।
ভেতরে আম।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
— কিছু চাইতে আসিনি।
সে ভেতরে ঢোকেনি।
শুধু দাঁড়িয়ে ছিল।
অদ্ভুতভাবে সেই দৃশ্যটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি অর্থবহ মনে হলো।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— রিদম কেমন আছে?
তানিয়া হালকা হাসল।
— ভালো। শনিবারে একটা স্টেশনারি দোকানে কাজ করে।
তারপর একটু থেমে বলল,
— আমি আর রিফাত আলাদা হয়ে গেছি।
আমি কোনো “বলেছিলাম তো” বলিনি।
কারণ এখন আর জেতার দরকার ছিল না।
তানিয়া নিচের সিঁড়িটার দিকে তাকাল।
যেটা নতুন করে বানানো হয়েছে।
— বৃষ্টি হলেই ওই রাতটার কথা মনে পড়ে।
আমি মাথা নাড়লাম।
— আমারও।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর সে বলল,
— ভাইয়া… আমাকে ক্ষমা করে দাও।
সত্যিকারের ক্ষমা চাওয়া খুব সাজানো হয় না।
সেখানে নাটক থাকে না।
দর্শক থাকে না।
শুধু ক্লান্তি আর অনুশোচনা থাকে।
আমি দরজাটা একটু খুলে দিলাম।
— ভেতরে এসে এক কাপ কফি খেতে পারো।
তানিয়ার চোখ ভিজে উঠল।
— সত্যি?
আমি হেসে বললাম,
— হ্যাঁ। তবে এই বাড়ি আর কারও আশ্রয়কেন্দ্র না।
সে মাথা নাড়ল।
— তাহলে এটা কী?
আমি ঘরের দিকে তাকালাম।
আমার টেবিল।
আমার বুকশেলফ।
আমার অফিস।
জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া বিকেলের আলো।
তারপর বললাম,
— এটা একটা বাড়ি। আর বাড়ি সেই মানুষকে সম্মান করে, যে এর দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে চলে।
তানিয়া ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
সাবধানে জুতা খুলল।
নিজে থেকে কিছু ধরল না।
ফ্রিজ খুলল না।
কিছু চাইল না।
শুধু চুপচাপ বসে কফির কাপটা দুই হাতে ধরে রাখল।
আমরা অনেক কথা বললাম।
তবে আগের মতো না।
সম্মান নিয়ে।
দূরত্ব নিয়ে।
বোঝাপড়া নিয়ে।
সেদিন একটা জিনিস বুঝেছিলাম—
অনেক পরিবার সীমারেখা টানার কারণে ভাঙে না।
বরং সীমারেখা না থাকার কারণেই ভেতরে ভেতরে ভেঙে যায়।
সীমারেখা শুধু সেই ভাঙার শব্দটাকে শোনা যায় এমন করে তোলে।
আজও যখন বর্ষা নামে, মাঝে মাঝে আমার গোড়ালিতে হালকা ব্যথা করে।
আবহাওয়া বদলানোর আগেই সে খবর দিয়ে দেয়।
তখন আমি দরজার সামনে দাঁড়াই।
নতুন আলোটার নিচে।
সেই সিঁড়িটার দিকে তাকাই।
আর ভাবি—
সেদিন আমি ভেবেছিলাম, আমার পরিবার আমাকে একা ফেলে দিয়েছে।
কিন্তু আসলে তারা আমাকে একটা সত্য দেখিয়েছিল।
কে আমার পাশে আছে।
আর কে শুধু আমার ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে ছিল।
সত্যটা খুব কষ্ট দিয়েছিল।
কিন্তু সেই কষ্টই আমাকে বাঁচিয়েছে।
কারণ নিজের জীবনে অতিথি হয়ে থাকার চেয়ে বড় ক্ষতি আর কিছু নেই।
আজ বাড়িটা শান্ত।
নীরব।
কিন্তু ফাঁকা না।
এখানে এখন এমন একটা জিনিস আছে, যেটার জন্য মানুষ সারা জীবন খোঁজে।
শান্তি।
#অচেনা_ঋণ
[লেখক #গল্প_ঘর]