ঘরের ভেতর তখন এমন এক নীরবতা, যেন কেউ শ্বাস নিলেও শব্দ শোনা যাবে।
তানিয়ার কান্না থামছে না।
মা মাথা নিচু করে বসে আছেন।
রিফাত দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে।
আর আমি…
আমি বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কী অনুভব করছি।
রাগ?
ঘৃণা?
নাকি এমন এক শূন্যতা, যার কোনো নাম নেই?
পাঁচ বছর।
পুরো পাঁচ বছর।
একটা মানুষের জীবনের পাঁচটা বছর।
যে সময়ে আমি নিজেকে দোষ দিয়েছি।
রাতের পর রাত ঘুমাতে পারিনি।
ভাবতাম, আমার কোনো ভুল ছিল।
কোথাও নিশ্চয়ই আমি কম পড়েছিলাম।
কিন্তু আজ জানলাম, আমি হারিনি।
আমাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
আমি ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়লাম।
প্লাস্টার করা পায়ে আবার ব্যথা শুরু হয়েছে।
কিন্তু সেই ব্যথা এখন তুচ্ছ।
মনের ভেতরের ব্যথার কাছে কিছুই না।
মেহরিন চুপচাপ বসে ছিল।
তার চোখ লাল।
মনে হচ্ছিল এত বছর ধরে জমে থাকা একটা বোঝা নামানোর চেষ্টা করছে।
আমি ধীরে বললাম,
— তুমি বলেছিলে, সব কথা এখনও বলোনি।
মেহরিন আমার দিকে তাকাল।
তারপর নিচু গলায় বলল,
— হ্যাঁ।
আমার বুক ধক করে উঠল।
মা মুখ তুললেন।
রিফাত অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসল।
তানিয়া কান্না থামানোর চেষ্টা করল।
মেহরিন বলল,
— সত্যিটা জানার পরে আমি শুধু তানিয়ার ব্যাপার জানিনি।
— তাহলে?
— আরও কিছু জেনেছিলাম।
আমি ভ্রু কুঁচকে তাকালাম।
— কী?
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
মনে হলো সাহস জোগাড় করছে।
তারপর বলল,
— তোমার দুর্ঘটনাটা…
আমার বুকের ভেতর হঠাৎ কেঁপে উঠল।
— দুর্ঘটনা?
— ওটা কি সত্যিই দুর্ঘটনা ছিল?
ঘরের বাতাস যেন মুহূর্তেই ভারী হয়ে গেল।
আমি সোজা হয়ে বসলাম।
— তুমি কী বলতে চাও?
মেহরিন বলল,
— আমি নিশ্চিত নই।
— তাহলে?
— কিন্তু কিছু বিষয় স্বাভাবিক মনে হয়নি।
রিফাত হঠাৎ বলল,
— এসব এখন বলার দরকার নেই।
মেহরিন তার দিকে তাকাল।
— কেন?
— কারণ এর কোনো প্রমাণ নেই।
— প্রমাণ না থাকলেই কি সত্যি বদলে যায়?
রিফাত চুপ করে গেল।
আমি এবার স্পষ্ট গলায় বললাম,
— যা জানো, সব বলো।
মেহরিন গভীর শ্বাস নিল।
— দুই মাস আগে আমি ঢাকায় একটা অফিসে কাজের জন্য গিয়েছিলাম।
— তারপর?
— সেখানে কাকতালীয়ভাবে একজনের সঙ্গে দেখা হয়।
— কে?
— তোমার ট্রাক দুর্ঘটনার মামলার সঙ্গে জড়িত একজন।
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সেই রাতটা মনে পড়ে গেল।
বৃষ্টিভেজা রাস্তা।
অন্ধকার।
হঠাৎ সামনে আলো।
তারপর বিকট শব্দ।
আর কিছু মনে নেই।
মেহরিন বলল,
— লোকটা বলেছিল, সেই মামলাটা অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়।
— কীভাবে?
— ট্রাক চালক হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়।
আমি থমকে গেলাম।
এ কথা আমাকে কেউ কখনও বলেনি।
মা অবাক হয়ে বললেন,
— নিখোঁজ?
— হ্যাঁ।
মেহরিন মাথা নাড়ল।
— আর তার আগেই সে নাকি বলেছিল, ব্রেক ফেল করেনি।
আমার কপালে ঘাম জমতে শুরু করল।
— কী?
— সে বলেছিল, কেউ তাকে নির্দিষ্ট গাড়িটাকে নজরে রাখতে বলেছিল।
ঘরে আবার নীরবতা।
রিফাত এবার স্পষ্ট অস্থির হয়ে উঠল।
— যথেষ্ট হয়েছে।
আমি তার দিকে তাকালাম।
— তুমি এত অস্থির হচ্ছ কেন?
সে উত্তর দিল না।
আমি লক্ষ্য করলাম, তার কপালেও ঘাম।
মেহরিন বলল,
— আমি জানি না এসব কতটা সত্যি।
— কিন্তু?
— কিন্তু আমার মনে হয়েছে, তোমার জানার অধিকার আছে।
আমি ধীরে ধীরে মাথা নিচু করলাম।
সবকিছু যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
পাঁচ বছর আগের বিচ্ছেদ।
তানিয়ার মিথ্যা।
রিফাতের নীরবতা।
আর এখন দুর্ঘটনা।
কী হচ্ছে এসব?
ঠিক তখনই—
আবু কাকার ফোন বেজে উঠল।
তিনি ফোন ধরলেন।
কয়েক সেকেন্ড কথা বললেন।
তারপর তার মুখের রঙ বদলে গেল।
আমরা সবাই তাকালাম।
ফোন কেটে তিনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
আমি বললাম,
— কী হয়েছে?
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
— হাসপাতালে থেকে ফোন ছিল।
— কেন?
— যে ট্রাকটা তোমার গাড়িকে ধাক্কা দিয়েছিল…
আমার বুক কেঁপে উঠল।
— তারপর?
— তার চালককে পাওয়া গেছে।
ঘরের সবাই একসাথে তাকিয়ে রইল।
আমি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে বললাম,
— কী?
— আজ বিকেলে।
— কোথায়?
— ময়মনসিংহের একটা ছোট ক্লিনিকে।
মেহরিন বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
মা হতভম্ব।
রিফাতের মুখ মুহূর্তেই সাদা হয়ে গেল।
আমি সেটা স্পষ্ট দেখলাম।
আর সেই প্রথমবার আমার মনে সন্দেহ জন্মাল।
রিফাত কি শুধু তানিয়ার গোপন কথা জানত?
নাকি আরও কিছু?
আবু কাকা বললেন,
— লোকটার অবস্থা নাকি খুব খারাপ।
— সে কি কথা বলতে পারবে?
— ডাক্তার বলেছে, হয়তো পারবে।
আমার বুকের ভেতর ধকধক শুরু হলো।
হয়তো…
হয়তো এতদিনের সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।
মেহরিন ধীরে বলল,
— তোমার ওর সঙ্গে দেখা করা উচিত।
আমি মাথা নাড়লাম।
— হ্যাঁ।
রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু ঘুমানোর প্রশ্নই ওঠে না।
একটা একটা করে এতগুলো সত্যি সামনে আসছে যে, মাথা কাজ করছিল না।
মা নিজের ঘরে চলে গেলেন।
তানিয়া দরজার কাছে বসে কাঁদছিল।
আমি তার দিকে তাকালাম।
সে ভাঙা গলায় বলল,
— ভাইয়া…
আমি চুপ।
— তুমি কি আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবে?
আমি অনেকক্ষণ উত্তর দিলাম না।
তারপর বললাম,
— জানি না।
তানিয়া আবার কেঁদে উঠল।
আমারও খারাপ লাগছিল।
কারণ সে আমার বোন।
আমার ছোটবেলার সঙ্গী।
কিন্তু একইসঙ্গে সে এমন একটা কাজ করেছে, যার ক্ষত পাঁচ বছরেও শুকায়নি।
রাত গভীর হলো।
সবাই যার যার ঘরে চলে গেল।
শুধু আমি আর মেহরিন বারান্দায় বসে রইলাম।
অনেক বছর পরে।
একসাথে।
কিন্তু মাঝখানে যেন পুরো একটা জীবন দাঁড়িয়ে আছে।
মেহরিন ধীরে বলল,
— তুমি কি আমাকে ঘৃণা করো?
আমি কিছুক্ষণ চুপ রইলাম।
তারপর বললাম,
— জানি না।
সে মাথা নিচু করল।
— আমি নিজেকেও ক্ষমা করতে পারিনি।
— কেন?
— কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করিনি।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
বাতাসে রাতের শীতলতা।
দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
সবকিছু এত পরিচিত।
আবার এত অচেনা।
মেহরিন বলল,
— একটা কথা বলব?
— বলো।
— আমি কোনোদিন তোমাকে ভালোবাসা বন্ধ করিনি।
আমার বুকের ভেতর কেমন যেন হয়ে গেল।
পাঁচ বছর আগের স্মৃতিগুলো একসাথে ফিরে এল।
স্বপ্ন।
পরিকল্পনা।
হাসি।
ভবিষ্যৎ।
সব।
কিন্তু আমি কিছু বললাম না।
কারণ আমার ভেতর এখনও ঝড় চলছে।
আর সেই ঝড় থামার আগে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।
ঠিক তখনই আমার ফোনে একটা মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
আমি ভ্রু কুঁচকে মেসেজটা খুললাম।
আর পড়তেই শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সেখানে শুধু একটা লাইন লেখা—
“ট্রাক চালকের সঙ্গে দেখা করতে যেও না। সত্যিটা জানলে তোমার সবচেয়ে কাছের মানুষটাকে হারাবে।”
আমি স্থির হয়ে গেলাম।
মেহরিন বলল,
— কী হয়েছে?
আমি ধীরে ধীরে ফোনটা তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম।
সে মেসেজটা পড়ল।
তারপর আমার দিকে তাকাল।
তার চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক।
আর তখনই আমরা দুজন বুঝতে পারলাম—
খেলা এখনও শেষ হয়নি।
বরং আসল খেলা এখন শুরু হয়েছে।
চলবে….