দরজার সামনে রাখা কার্টনের বাক্সগুলোর দিকে তাকিয়ে আবু কাকা বিড়বিড় করে বললেন,
— বাহ! পরজীবীদেরও দেখি সাজসজ্জার শখ আছে।
ব্যথার মধ্যেও আমার হাসি পেয়ে গেল।
ধীরে ধীরে ভর দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম।
দুই হাতে ক্রাচ।
পায়ে ভারী প্লাস্টার।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, আমাকে সবচেয়ে বেশি ভর দিচ্ছে আমার নীরব রাগ।
রান্নাঘরে ঢুকেই দেখি তানিয়া ডিম ভাজছে।
আমার ফ্রাইপ্যানে।
আমার কেনা ডিম।
আমার টাকায় কেনা গ্যাসে।
সে পেছন ফিরে না তাকিয়েই বলল,
— ভালোই হয়েছে ফিরছো। আমাদের বড়দের মতো বসে কথা বলা দরকার।
আমি শান্তভাবে বললাম,
— খুব ভালো।
ডাইনিং টেবিলের পাশে গিয়ে বসলাম।
কিছুক্ষণ পর রিফাত ঘুমজড়ানো মুখে বের হলো।
তার পেছনে রিদম।
চুল এলোমেলো।
গলায় হেডফোন ঝুলছে।
ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে উঠল।
তানিয়া ভ্রু কুঁচকাল।
— কে?
আমি বললাম,
— যে মানুষটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
আবু কাকা গিয়ে দরজা খুললেন।
ভেতরে ঢুকলেন একজন নারী।
সাদামাটা শাড়ি।
হাতে কালো ফাইল।
চোখে চশমা।
মুখে এমন এক ধরনের স্থিরতা, যা অকারণে কখনো উচ্চস্বরে কথা বলে না।
তিনি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পুরোনো বন্ধু।
অ্যাডভোকেট নওরীন রহমান।
ঘরে ঢুকেই তিনি বললেন,
— আসসালামু আলাইকুম। আমি অ্যাডভোকেট নওরীন রহমান। সায়েম সাহেবের পক্ষ থেকে এসেছি।
রিফাত ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।
— ও আচ্ছা! তাই নাকি?
নওরীন একবার শুধু তার দিকে তাকালেন।
এক সেকেন্ড।
তারপর রিফাতের হাসিটা নিজে থেকেই মিলিয়ে গেল।
নওরীন আমার পাশে বসে ফাইল খুললেন।
তারপর একদম শান্ত গলায় বললেন,
— তানিয়া আপা, রিফাত সাহেব। সায়েম সাহেব আপনাদের এই বাসায় সাময়িক ও বিনা খরচে থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন। কোনো ভাড়ার চুক্তি নেই। কোনো আর্থিক অংশীদারিত্ব নেই। সম্পত্তির উপর আপনাদের কোনো মালিকানা নেই। আজ থেকে সেই অনুমতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
তানিয়া সঙ্গে সঙ্গে টেবিলে হাত চাপড়ে উঠল।
— আমি তার বোন!
নওরীনের চোখের পাতা পর্যন্ত নড়ল না।
— বোন হওয়া মালিকানার কাগজ না।
রিদম মাথা নিচু করে ফেলল।
রিফাত দুই হাত গুটিয়ে বসল।
— আমাদেরও অধিকার আছে।
নওরীন মাথা নাড়লেন।
— অবশ্যই আছে। এজন্যই আপনাদের জিনিসপত্র রাস্তায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে না। আপনাদের ত্রিশ দিনের সময় দেওয়া হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে স্বেচ্ছায় বাসা ছেড়ে দেবেন। অন্যথায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি একটু থামলেন।
তারপর বললেন,
— আর গতরাতে আহত অবস্থায় একজন মানুষকে সাহায্য না করার ঘটনাটারও সাক্ষী ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি রয়েছে।
তানিয়া আমার দিকে তাকাল।
যেন আমাকে নতুন করে দেখছে।
— তুমি আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছো?
আমি বললাম,
— এখনও করিনি। আমাকে বাধ্য কোরো না।
তার চোখ ভিজে উঠল।
একসময় এই কান্না আমাকে দুর্বল করে দিত।
আজ শুধু ক্লান্ত লাগছিল।
তানিয়া ফিসফিস করে বলল,
— তুমি আগে এমন ছিলে না।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
— ছিলাম। শুধু নিজের জন্য দাঁড়ালে অপরাধবোধ হতো।
রিফাত সামনের দিকে ঝুঁকে এলো।
— আচ্ছা বলেন তো, আমরা চলে গেলে এই অবস্থায় আপনাকে দেখবে কে? রান্না করবে কে?
আমি হেসে ফেললাম।
তারপর বললাম,
— মজার কথা। গতকাল তো তোমরা বলেছিলে, তোমরা আমার চাকর না।
তানিয়া ঠোঁট কামড়ে ধরল।
— আমরা ক্লান্ত ছিলাম।
আমি বললাম,
— আমিও ছিলাম। গত আট মাস ধরে।
নওরীন একটা কাগজ তাদের দিকে এগিয়ে দিলেন।
— আজ থেকেই কিছু নিয়ম কার্যকর হবে। সায়েম সাহেবের ঘর, অফিস রুম এবং ব্যক্তিগত স্টোররুম তালাবদ্ধ থাকবে। তার ব্যাংক কার্ড, গাড়ি, কাগজপত্র কিংবা ব্যক্তিগত জিনিসে কারও প্রবেশাধিকার থাকবে না। খাবার ও ব্যক্তিগত খরচ প্রত্যেকে নিজ দায়িত্বে বহন করবেন।
রিফাত বিরক্ত হয়ে বলল,
— এটা অপমান।
আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম,
— অপমান হলো, যার বাড়িতে থাকো তাকে মাটিতে ফেলে রেখে টিভি দেখা।
কথাটা এবার তার গায়ে লাগল।
সে চেয়ার ঠেলে উঠে বাইরে চলে গেল।
তানিয়া কাঁদতে শুরু করল।
— আমরা এখন কোথায় যাব?
এই প্রশ্নটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
এই প্রশ্নের কারণেই আমি এতদিন চুপ ছিলাম।
এই প্রশ্নের কারণেই নিজের সীমারেখাগুলো মুছে ফেলেছিলাম।
আমি অনেকক্ষণ তানিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
মনে পড়ল ছোটবেলার কথা।
স্কুলে যাওয়ার আগে চুল এলোমেলো করে আমার পেছনে ঘুরে বেড়াত।
বৃষ্টির দিনে একা দোকানে যেতে ভয় পেত।
আমার হাত শক্ত করে ধরে থাকত।
সেই ছোট্ট বোনটার মুখ এক মুহূর্তের জন্য দেখতে পেলাম।
তারপর বাস্তবে ফিরে এলাম।
আমি শান্ত গলায় বললাম,
— জানি না। কিন্তু এখানে না।
তানিয়া মাথা নাড়ল।
— মা জানলে তোমাকে স্বার্থপর বলবে।
আমি বললাম,
— তাহলে মাকে বিলগুলাও দেখিও।
দশ মিনিট পরই মায়ের ফোন এলো।
একবার।
দুইবার।
তিনবার।
আমি ধরলাম না।
তারপর একটা ভয়েস মেসেজ এলো।
“সায়েম, তোর বোন বলছে তুই ওদের রাস্তায় নামিয়ে দিচ্ছিস। আমি তোকে এমন শিক্ষা দিইনি। পরিবারকে ফেলে দেওয়া যায় না।”
আমি মেসেজটা সবার সামনে চালিয়ে দিলাম।
তানিয়ার চোখে আশার ঝিলিক দেখা গেল।
মনে হলো, এবার মা তার পক্ষ নেবেন।
মেসেজ শেষ হতেই আমি নিজের উত্তর রেকর্ড করলাম।
“মা, গতকাল আমি নিজের বাড়ির সামনে বৃষ্টির মধ্যে পড়ে ছিলাম। আমার পা ভেঙে গেছে। তানিয়া, রিফাত আর রিদম আমাকে দেখেছে। কেউ সাহায্য করেনি। আবু কাকা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। তানিয়া বলেছে, ‘আমরা কি তোমার চাকর?’ এখন ওদের ত্রিশ দিন সময় দিয়েছি। যদি পরিবার নিয়ে কথা বলতে চাও, তাহলে এখান থেকেই শুরু করো।”
মেসেজ পাঠিয়ে দিলাম।
ঘরে নীরবতা নেমে এলো।
কয়েক সেকেন্ড পর তানিয়ার ফোন বেজে উঠল।
সে স্পিকার অন করেনি।
কিন্তু মায়ের চিৎকার আমরা সবাই শুনতে পেলাম।
— তুই এটা কী করেছিস তানিয়া?
তানিয়া কাঁদতে কাঁদতে নিজের ঘরে চলে গেল।
সেদিন সন্ধ্যায় আবু কাকার সাহায্যে আমি বাড়ির প্রবেশপথ, করিডোর আর রান্নাঘরে সিসিটিভি লাগালাম।
ওয়াইফাইয়ের পাসওয়ার্ড বদলে ফেললাম।
স্টোররুম আলাদা করে তালা দিলাম।
খাবারের জিনিসপত্রও আলাদা করে রাখলাম।
এসব আমি আনন্দ নিয়ে করিনি।
প্রয়োজন বলে করেছি।
সেদিন রাতে প্রথমবার আমি সবার জন্য রান্না করিনি।
নিজের জন্য আর আবু কাকার জন্য গরম চিকেন স্যুপ অর্ডার করেছিলাম।
রান্নাঘর ভরে গিয়েছিল লেবু, গোলমরিচ আর মুরগির স্যুপের গন্ধে।
কিছুক্ষণ পর দরজার পাশে এসে দাঁড়াল রিদম।
নিচু গলায় বলল,
— মামা… আমি কি একটু খেতে পারি?
আমি তার দিকে তাকালাম।
আমি তাকে ক্ষুধার শাস্তি দিতে চাইনি।
আবার ভুলটাকেও পুরস্কৃত করতে চাইনি।
আমি বললাম,
— পারো। তবে আগে একটা কথা বলো।
সে অস্বস্তিতে গিলল।
— কী কথা?
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— গতকাল আমাকে সাহায্য করোনি কেন?
রিদমের চোখ ভিজে উঠল।
— বাবা বলেছিল, আমি যেন কিছু না করি। বলেছিল, তুমি নাকি মনোযোগ পাওয়ার জন্য বাড়িয়ে বলছো।
আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
— আর তুমি কী ভেবেছিলে?
সে মাথা নিচু করল।
— আমার ভয় লাগছিল। কিন্তু ওরা রাগ করবে বলে কিছু করিনি।
আমি ধীরে ধীরে তার সামনে স্যুপের বাটি এগিয়ে দিলাম।
— খাও। আর একটা কথা মনে রাখবে। মাটিতে পড়ে থাকা কাউকে সাহায্য করা কোনো পক্ষ নেওয়া না। এটা মানুষ হওয়া।
রিদম মাথা নাড়ল।
চোখ মুছতে মুছতে খেতে লাগল।
আমি তাকে জড়িয়ে ধরিনি।
শুধু একটা অতিরিক্ত রুটি এগিয়ে দিয়েছিলাম।
পরের কয়েকটা দিন ছিল নিঃশব্দ যুদ্ধের মতো।
রিফাত ইচ্ছে করে নোংরা প্লেট ফেলে রাখত।
আমি সেগুলো একটা প্লাস্টিকের বাক্সে ভরে তার ঘরের সামনে রেখে দিতাম।
তানিয়া গভীর রাতে ওয়াশিং মেশিন চালাত।
আমি লন্ড্রি রুমের সময় বেঁধে দিলাম।
রিদম ধীরে ধীরে নিজের প্লেট নিজে ধোয়া শুরু করল।
রিফাত একদিন আমার গাড়ি নিয়ে বের হতে চেয়েছিল।
কিন্তু চাবি খুঁজে পায়নি।
এক সপ্তাহ পরে মা এলেন।
হাতে মিষ্টির বাক্স।
মুখে বিচারকের মতো কঠিন ভাব।
দরজা দিয়ে ঢুকেই তিনি আমাকে ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন।
তার মুখের কঠোরতা এক মুহূর্তের জন্য নরম হয়ে গেল।
তিনি এগিয়ে এসে বললেন,
— সায়েম, বাবা…
চলবে…
#অচেনা_ঋণ
[লেখক #গল্প_ঘর]