সন্ধ্যার আজান শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে।
ঘরের ভেতর এখনও অদ্ভুত একটা চাপা নীরবতা।
মা চুপচাপ বসে আছেন।
তানিয়া নিজের চোখ মুছছে।
রিফাত মাথা নিচু করে আছে।
আর আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকার নামা দেখছি।
কথা বলার মতো কিছু যেন আর বাকি নেই।
ঠিক তখনই—
**টক… টক… টক…**
দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
সবাই একসাথে তাকাল।
আবু কাকা বললেন,
— আমি দেখি।
তিনি দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
দরজা খুলতেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে তার মুখের ভাব বদলে গেল।
তিনি কয়েক সেকেন্ড কিছু বললেন না।
তারপর ধীরে ধীরে সরে দাঁড়ালেন।
আমি কৌতূহলী হয়ে তাকালাম।
আর পরের মুহূর্তেই আমার বুকের ভেতর কেমন যেন ধাক্কা লাগল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন মহিলা।
সাদা-কালো সালোয়ার কামিজ।
কাঁধ পর্যন্ত চুল।
চোখে ক্লান্তির ছাপ।
কিন্তু সেই চোখ আমি চিনতে ভুল করলাম না।
পাঁচ বছর পরেও না।
আমার মুখ থেকে অজান্তেই বের হয়ে গেল—
— মেহরিন?
ঘরটা যেন হঠাৎ নিঃশব্দ হয়ে গেল।
তানিয়ার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
রিফাতও অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসল।
মা বিস্মিত হয়ে আমার দিকে তাকালেন।
তারপর মহিলার দিকে।
মেহরিন ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
তার চোখ কয়েক সেকেন্ড আমার প্লাস্টার করা পায়ের দিকে স্থির রইল।
তারপর নিচু গলায় বলল,
— কেমন আছ?
প্রশ্নটা খুব সাধারণ।
কিন্তু উত্তরটা আমার কাছে সহজ ছিল না।
পাঁচ বছর আগে যে মানুষটা হঠাৎ করেই আমার জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল…
সে আজ আমার সামনে দাঁড়িয়ে।
আমি শান্ত থাকার চেষ্টা করলাম।
— বেঁচে আছি।
মেহরিন মৃদু মাথা নাড়ল।
তার চোখে কষ্টের একটা ছায়া দেখা গেল।
মা এবার বললেন,
— তুমি?
— আমি মেহরিন।
— সায়েমের পরিচিত?
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ রইল।
তারপর বলল,
— একসময় খুব কাছের মানুষ ছিলাম।
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো।
তানিয়া চোখ বন্ধ করে ফেলল।
আমি সেটা খেয়াল করলাম।
আর তখনই আমার মনে হলো—
এখানে কিছু আছে।
কিছু একটা, যা আমি জানি না।
মেহরিন ধীরে ধীরে সোফায় বসল।
তার হাত দুটো কাঁপছিল।
আমি বললাম,
— এত বছর পরে হঠাৎ?
সে আমার দিকে তাকাল।
— কারণ আর দেরি করলে হয়তো সাহস পেতাম না।
— কীসের সাহস?
মেহরিন গভীর শ্বাস নিল।
— সত্যি বলার সাহস।
আমার বুকের ভেতর কেমন অস্বস্তি শুরু হলো।
মা অবাক হয়ে বললেন,
— কী সত্যি?
মেহরিন উত্তর দিল না।
বরং তানিয়ার দিকে তাকাল।
তানিয়া তখন মাথা নিচু করে বসে আছে।
একদম নিস্তব্ধ।
মেহরিন ধীরে ধীরে বলল,
— তুমি কি নিজে বলবে?
তানিয়া কেঁপে উঠল।
— না…
— কতদিন লুকাবে?
— প্লিজ…
— পাঁচ বছর কি যথেষ্ট না?
আমার মাথার ভেতর যেন শব্দ হতে লাগল।
আমি বললাম,
— কেউ আমাকে বুঝিয়ে বলবে কী হচ্ছে?
রিফাত হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
— আজ এসব কথা না বলাই ভালো।
মেহরিন তার দিকে তাকাল।
দৃষ্টি ঠান্ডা।
কঠিন।
— তুমি চুপ থাকো।
— দেখুন—
— পাঁচ বছর আগে তুমিও চুপ ছিলে।
রিফাত আর কথা বলল না।
মা এবার স্পষ্ট বিরক্ত হলেন।
— কেউ যদি আমাকে পুরো ব্যাপারটা না বলে, আমি কিছুই বুঝব না।
মেহরিন ধীরে ধীরে আমার দিকে ফিরল।
তার চোখে জল।
— সায়েম, তোমার কি মনে আছে আমি হঠাৎ করে কেন চলে গিয়েছিলাম?
প্রশ্নটা শুনে আমার বুকের ভেতর পুরোনো একটা ব্যথা জেগে উঠল।
অবশ্যই মনে আছে।
খুব ভালো করেই মনে আছে।
সেদিনও এমনই এক সন্ধ্যা ছিল।
আমরা বিয়ের পরিকল্পনা করছিলাম।
হঠাৎ সে দূরে সরে যেতে শুরু করল।
ফোন কমে গেল।
মেসেজ কমে গেল।
তারপর একদিন জানাল—
সব শেষ।
কোনো ব্যাখ্যা নেই।
কোনো কারণ নেই।
শুধু শেষ।
আমি বললাম,
— তুমি বলেছিলে তুমি আর আমাকে ভালোবাসো না।
মেহরিন চোখ বন্ধ করল।
— মিথ্যা বলেছিলাম।
ঘর নিস্তব্ধ।
আমি তাকিয়ে রইলাম।
মনে হলো আমি ঠিক শুনিনি।
— কী?
— আমি মিথ্যা বলেছিলাম।
— কেন?
মেহরিন এবার কাঁদতে শুরু করল।
— কারণ আমাকে মিথ্যা বলতে বাধ্য করা হয়েছিল।
আমার শরীরের রক্ত যেন জমে গেল।
— কে?
মেহরিন ধীরে ধীরে তানিয়ার দিকে তাকাল।
আর সেই মুহূর্তে তানিয়ার কান্না ভেঙে পড়ল।
মা হতভম্ব।
আমি স্থির।
রিফাত মুখ ফিরিয়ে আছে।
মেহরিন বলল,
— তোমার বোন।
আমার কানে যেন শব্দ ঢুকছিল না।
আমি শুধু তাকিয়ে ছিলাম।
তানিয়া ফুঁপিয়ে উঠল।
— ভাইয়া…
— কী বলছে ও?
তানিয়া উত্তর দিল না।
আমি এবার গলা উঁচু করলাম।
— তানিয়া!
সে কেঁদে ফেলল।
— আমি ভুল করেছি।
আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
— কোন ভুল?
মেহরিন বলল,
— তোমার বোন আমার কাছে এসেছিল।
— কেন?
— সে বলেছিল তুমি নাকি বদলে গেছ।
— তারপর?
— বলেছিল তুমি অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্ক করছ।
আমি স্তব্ধ।
মা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন।
মেহরিন বলল,
— আমি বিশ্বাস করিনি।
— তারপর?
— সে আমাকে অনেক কিছু দেখিয়েছিল।
— কী?
— ভুয়া ছবি।
— কী?
— এডিট করা চ্যাট।
আমার হাত মুঠো হয়ে গেল।
তানিয়া হাউমাউ করে কাঁদছে।
আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
মেহরিন বলল,
— পরে সে বলল, তুমি আমাকে বিয়ে করলে নাকি পরিবার ভেঙে যাবে।
— পরিবার?
— সে বলেছিল তুমি নাকি তার কথা আর শুনবে না।
মা নিজের মুখে হাত চাপা দিলেন।
— হে আল্লাহ…
আমি ধীরে ধীরে তানিয়ার দিকে তাকালাম।
— এটা সত্যি?
তানিয়া কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ল।
— আমি তখন বোকা ছিলাম ভাইয়া।
— বোকা?
আমার গলা কেঁপে উঠল।
— একটা মানুষের জীবন ভেঙে দিয়েছ।
সে কাঁদছিল।
— আমি ভেবেছিলাম পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমি হেসে ফেললাম।
একটা অদ্ভুত হাসি।
যেখানে আনন্দ নেই।
শুধু হতাশা।
— সব ঠিক হয়ে যাবে?
মেহরিন নিচু গলায় বলল,
— আমি সত্যিটা জানতে পারি দুই বছর পরে।
— তারপর?
— তখন তুমি আর কারও সঙ্গে মিশতে না।
— তাই?
— আমি যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলাম।
— করেছিলে?
— তুমি নম্বর বদলে ফেলেছিলে।
আমি চুপ করে গেলাম।
সত্যি।
আমি বদলে ফেলেছিলাম।
কারণ অতীত থেকে পালাতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু অতীত আজ নিজেই দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
মা ধীরে ধীরে তানিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
তার চোখে জল।
কিন্তু সেই জলের চেয়েও বেশি ছিল হতাশা।
— তুই এটা করেছিস?
তানিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আমি চাইনি ভাইয়া আমাকে ছেড়ে অন্য কাউকে বেশি গুরুত্ব দিক।
মা কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়লেন।
মনে হলো তিনি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না।
রিফাত এবার বলল,
— ও তখন খুব ইমোশনাল ছিল।
আমি তার দিকে তাকালাম।
— আর তুমি?
সে চুপ।
— তুমি জানতে?
নীরবতা।
এই নীরবতাই উত্তর।
আমার বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ল।
— তুমিও জানতে?
রিফাত মাথা নিচু করল।
— হ্যাঁ।
ঘরটা হঠাৎ আরও ছোট মনে হতে লাগল।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
পাঁচ বছর।
পুরো পাঁচ বছর।
আমি নিজেকে দোষ দিয়েছি।
মেহরিনকে দোষ দিয়েছি।
ভাগ্যকে দোষ দিয়েছি।
কিন্তু সত্যিটা ছিল আমার নিজের বাড়ির ভেতর।
আমার নিজের মানুষের কাছে।
জানালার বাইরে তখন রাত নেমে গেছে।
দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে।
ঘরের ভেতর শুধু কান্নার শব্দ।
আর আমি অনুভব করছিলাম—
যে ঝড়ের কথা আমি ভাবছিলাম…
সেটা সত্যিই শুরু হয়েছে।
আর এই ঝড় শেষ হওয়ার আগে—
আরও অনেক মুখোশ খুলে যাবে।
কারণ মেহরিন এখনও সব কথা বলেনি।
আর তার পরের কথাটা শুনে…
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর সামনে এসে দাঁড়াবে।
**(চলবে)**