তানিয়া বিরক্ত চোখে আমার দিকে তাকাল।
বলল,
— এখন আবার কী বলতে চাও?
কথাটা আমার ভাঙা পায়ের ব্যথার চেয়েও বেশি কষ্ট দিল।
আবু কাকা তখনও নিচু হয়ে আমার পা দেখছিলেন। তিনি বিস্মিত চোখে তানিয়ার দিকে তাকালেন।
মনে হলো, তিনি নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না।
বললেন,
— তোমার ভাই আহত। তোমাকে তো চা বানাতে বলেনি।
তানিয়া বুকের সামনে দুই হাত গুটিয়ে দাঁড়াল।
— আবু কাকা, আপনি মাঝখানে আসবেন না। আপনি জানেন না এখানে কী হয়।
আমি ফ্যাকাসে একটা হাসি দিলাম।
— না তানিয়া, উনি জানেন। অন্তত উনি সেই জিনিসটা দেখেছেন, যেটা তোমরা দেখতে চাওনি।
রিফাত অবশেষে টিভিটা বন্ধ করল।
আমার জন্য না।
বরং বুঝতে পেরেছিল, এখন আর ঘটনাটা শুধু আমাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
একজন সাক্ষী আছে।
সে সোফায় হেলান দিয়ে বলল,
— সায়েম ভাই, ব্যাপারটা এত বড় করার কী আছে? আপনি পড়ে গেছেন। অ্যাম্বুলেন্স তো আসছেই।
আমি শান্ত গলায় বললাম,
— আসছে কারণ আবু কাকা ফোন করেছেন।
রিদম বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল।
— আমি কি আমার রুমে যেতে পারি?
আমার বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠল।
রুম?
যে ঘরটা অতিথিদের জন্য বানিয়েছিলাম?
যে বাড়িটা আমার?
যার বিদ্যুৎ বিল আমি দিই?
যার ইন্টারনেট আমি চালাই?
যার প্রতিটা ইটের সঙ্গে আমার সাত বছরের ঘাম লেগে আছে?
আমি ছেলেটার দিকে তাকালাম।
রাগ হলো না।
অদ্ভুত এক কষ্ট হলো।
কারণ সে যা শিখছে, তা তার নিজের দোষ না।
সে শিখছে—অন্যের কষ্টের উপর দাঁড়িয়ে থাকাও স্বাভাবিক।
সে শিখছে—যে মানুষ সাহায্য করে, একসময় তাকেই গুরুত্বহীন ভাবা যায়।
আমি বললাম,
— না। এখানেই থাকো। এই কথাগুলো তোমারও শোনা দরকার।
তানিয়া সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এল।
— আমার ছেলের সঙ্গে এভাবে কথা বলবা না।
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,
— তাহলে তাকে শেখাও, ফোনে তাকিয়ে না থেকে অন্তত একবার তার মামার দিকে তাকাতে, যে আধঘণ্টা ধরে বৃষ্টির মধ্যে পড়ে ছিল।
তানিয়া কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে।
দরজার নিচ দিয়ে পানি ঢুকে ভাঙা ডিমের খোসার একটা টুকরো ভাসিয়ে নিয়ে গেল।
মনে হলো, বাড়িটাও যেন আজ সবকিছু বাইরে ফেলে দিতে চাইছে।
আবু কাকা একটা তোয়ালে এনে আমার পায়ের নিচে রাখলেন।
তারপর নিচু গলায় বললেন,
— সায়েম, আমি ডাক্তার না, কিন্তু ফোলাটা ভালো লাগতেছে না।
আমি মাথা নাড়লাম।
ব্যথা তখন কপাল পর্যন্ত উঠছে।
জুতাটা পায়ে যেন ফাঁদের মতো চেপে বসেছে।
আমি দাঁত চেপে বললাম,
— খুলে দেন।
আবু কাকা চারদিকে তাকালেন।
— কাঁচি আছে?
কেউ নড়ল না।
তানিয়া না।
রিফাতও না।
শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই রান্নাঘরে গেলেন।
ড্রয়ার খুলে কাঁচি বের করলেন।
ধীরে ধীরে জুতার ফিতা কেটে দিলেন।
তারপর সাবধানে জুতা খুলতে শুরু করলেন।
আমি ব্যথায় চিৎকার করে উঠলাম।
নিজেকে আটকাতে পারলাম না।
তানিয়া বিরক্ত মুখে বলে উঠল,
— আল্লাহ! এত নাটক!
ঠিক তখনই আমার ভেতরে সবকিছু শেষ হয়ে গেল।
চিৎকার করে না।
রাগ দেখিয়ে না।
নিঃশব্দে।
যেমন কোনো দরজা আস্তে করে বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু আর কখনও খোলে না।
আমি ধীরে ধীরে বললাম,
— তোমাদের পাঁচ মিনিট সময় দিলাম।
রিফাত ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— পাঁচ মিনিট? কেন?
আমি বললাম,
— বুঝে নেওয়ার জন্য যে এই বাড়ি আর অকৃতজ্ঞ মানুষের আশ্রয় না।
তানিয়া অস্বস্তিকর হাসি দিল।
— মানে? আমাদের বের করে দিবা? শুধু এজন্য যে আমরা তোমাকে রাজাদের মতো কোলে করে আনিনি?
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তারপর বললাম,
— না। তোমাদের বের করে দেব কারণ আট মাস ধরে তোমরা এই বাড়িতে বিনা খরচে থাকছো। আর আজ যখন আমাকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলে, তখন আমার ভাঙা পায়ের চেয়ে ছড়িয়ে পড়া দুধ তোমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
রিফাত বিরক্ত হয়ে বলল,
— পা ভাঙে নাই।
আমি তার চোখে চোখ রেখে বললাম,
— তাহলে তুমি পরে দেখে আসো।
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো।
আমি ফোন বের করলাম।
হাত কাঁপছিল।
ব্যথায় আঙুল ঠিকমতো কাজ করছিল না।
তবুও নোটস খুললাম।
সেখানে একটা তালিকা ছিল।
আজ রাতে লেখা না।
তিন মাস আগে লেখা শুরু করেছিলাম।
যেদিন ভোরবেলা ঘুম ভেঙে দেখেছিলাম রিফাত আমার ব্যাংক কার্ড দিয়ে খাবার অর্ডার করেছে।
তারপর যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে ঘুরে বেড়িয়েছে।
আমি পড়তে শুরু করলাম।
— বাড়িভাড়া, শূন্য।
— আট মাসের বিদ্যুৎ বিল।
— আট মাসের গ্যাস বিল।
— আট মাসের পানির বিল।
— আট মাসের ইন্টারনেট বিল।
— প্রতি সপ্তাহের বাজার।
— রিদম অসুস্থ হলে ওষুধের খরচ।
— রিফাতের মোটরসাইকেলের বীমার টাকা।
— ভাঙা টিভির স্ক্রিন মেরামত।
— নতুন ওয়াশিং মেশিন।
আমি একবার থামলাম।
তারপর বললাম,
— সব মিলিয়ে কয়েক লক্ষ টাকারও বেশি খরচ হয়েছে। আর বাড়ির ঋণের কিস্তির কথা তো বাদই দিলাম।
তানিয়ার মুখের রং বদলে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল,
— তুমি আমাদের হিসাব রাখছো?
আমি উত্তর দিলাম,
— হ্যাঁ।
সে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
— তুমি অসুস্থ।
আমি মাথা নাড়লাম।
— না। অসুস্থ আমি না। অসুস্থ হলো সেই মানুষ, যে নিজের ভাইকে চাকর ভাবে, অথচ তার বাড়িতেই থাকে।
রিফাত গভীর শ্বাস নিল।
— যাই হোক, এই বাড়িটা এখন আমাদেরও বাড়ি।
আমি এক সেকেন্ডও দেরি করলাম না।
— না।
শব্দটা শুকনো ছিল।
কঠিন ছিল।
আমি বললাম,
— এটা আমার বাড়ি। আর তোমরা এখানে থাকো। এই দুইটা জিনিস এক না।
রিদম চুপচাপ বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
হয়তো প্রথমবার সে পার্থক্যটা বুঝতে শুরু করল।
অ্যাম্বুলেন্স আসতে প্রায় বিশ মিনিট লেগে গেল।
বৃষ্টির জন্য পুরো এলাকা জলমগ্ন হয়ে ছিল।
রাস্তার আলো পানিতে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।
গাড়ির চাকা কাদায় শব্দ তুলছিল।
দূরে দূরে কুকুর ডাকছিল।
অবশেষে চিকিৎসাকর্মীরা এলেন।
তারা আমাকে স্ট্রেচারে তুললেন।
একজন জিজ্ঞেস করলেন,
— সঙ্গে কে যাবেন?
তানিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।
রিফাত চুপ করে রইল।
তারপর তানিয়া বলল,
— আমি থাকতে পারব না। ছেলেকে দেখতে হবে।
রিদমের বয়স পনেরো।
সে কোনো ছোট বাচ্চা না।
আবু কাকা তখন আমার মানিব্যাগ আর চাবি হাতে তুলে নিলেন।
বললেন,
— আমি যাচ্ছি ওর সঙ্গে।
স্ট্রেচারে শুয়ে আমি শেষবারের মতো তানিয়ার দিকে তাকালাম।
তারপর বললাম,
— কাল সকাল নয়টায় আইনজীবী আসবে।
তানিয়া কৃত্রিম হাসি দিল।
— আইনজীবী? সায়েম, তুমি সত্যিই হাস্যকর হয়ে গেছো।
আমি শান্ত গলায় বললাম,
— আর তুমি সীমা ছাড়িয়ে গেছো।
অ্যাম্বুলেন্সের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
শেষ মুহূর্তে দেখলাম, তানিয়া আমার বাড়ির দরজার নিচে দাঁড়িয়ে আছে।
শুকনো।
নিরাপদ।
আরামদায়ক।
আর আমি?
আমি ভিজে কাপড়ে কাঁপছি।
পা ভেঙে গেছে।
তবুও গত আট মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো মনে হলো—
আমি নিজের সম্মান নিয়ে এই বাড়ি থেকে বের হচ্ছি।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলো।
ডাক্তার নিশ্চিত করলেন—
এটা মচকানো না।
সত্যিই হাড় ভেঙেছে।
পায়ে প্লাস্টার করা হলো।
ব্যথার ওষুধ দেওয়া হলো।
পর্যবেক্ষণে রাখা হলো কয়েক ঘণ্টা।
আবু কাকা রাত তিনটা পর্যন্ত আমার পাশে বসে রইলেন।
একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে।
হাতে হাসপাতালের ভেন্ডিং মেশিনের কফি।
আমি ধীরে বললাম,
— আপনাকে এত ঝামেলায় ফেললাম, দুঃখিত।
তিনি হেসে মাথা নাড়লেন।
— পরিবার আর পরিবারের নামে সুযোগ নেওয়া—এই দুইটা আলাদা জিনিস, বাবা।
আমি সাদা ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
চুপচাপ বললাম,
— আমিই তো ওদের এনেছিলাম।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— এনেছো। কিন্তু ওদের তোমার উপর উঠতে বলোনি।
আমি কিছু বললাম না।
কারণ সত্যিটা হলো—
আমি ধীরে ধীরে সেই সুযোগটাই দিয়েছিলাম।
প্রতিদিন একটু একটু করে।
সকালে হাসপাতাল থেকে বের হলাম।
আবু কাকা গাড়ি চালাচ্ছিলেন।
বৃষ্টি থেমে গেছে।
রাস্তার পাশের দোকানগুলো খুলছে।
চায়ের দোকানে ভিড় জমছে।
গরম পরোটার গন্ধ বাতাসে ভাসছে।
জীবন স্বাভাবিকভাবেই চলতে আছে।
আমার কষ্টের জন্য পৃথিবী থেমে থাকেনি।
বাড়ির সামনে পৌঁছে আমি জানালা দিয়ে তাকালাম।
দেখলাম, রিফাত কয়েকটা বড় কার্টন এনে দরজার সামনে রেখেছে।
বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার জন্য না।
বরং…
চলবে…
#অচেনা_ঋণ
[লেখক #গল্প_ঘর]