“আমার আপন ছোট বোনটা তার স্বামী আর ছেলেকে নিয়ে আমার বাসায় একদম বিনা খরচে থাকত…
আর এক বৃষ্টির রাতে, নিজের বাসার দরজার সামনেই আমি পড়ে গিয়ে আহত হলে সে শুধু বলেছিল—
‘আমরা কি তোমার চাকর নাকি?’
আমি তখন ভিজে মেঝেতে পড়ে আছি… আর তারা ঘরের ভেতরে বসে টিভি দেখছে, যেন কিছুই হয়নি।
শেষ পর্যন্ত নিজের পরিবার না, পাশের বাসার মানুষ আমাকে ধরে তুলেছিল।
আর সেদিন রাতেই, ভাঙা গোড়ালির যন্ত্রণা নিয়ে আমি ওদের বুঝিয়ে দিয়েছিলাম—
এই বাড়িটা আর অকৃতজ্ঞ মানুষের আশ্রয় না।”
আমার নাম সায়েম।
এই বাড়িটা কিনেছিলাম আমি একত্রিশ বছর বয়সে।
কেউ আমাকে বাড়িটা উপহার দেয়নি।
কেউ পাশে দাঁড়িয়ে বলেনি, “নাও, এটা তোমার স্বপ্ন।”
এই একটা বাড়ির জন্য আমি সাতটা বছর জীবন থেকে কেটে ফেলেছি।
সকালে অফিস, রাতে অতিরিক্ত শিফট।
বন্ধুদের আড্ডা বাদ।
ঈদের শপিং বাদ।
নিজের ইচ্ছেগুলোকে প্রতিদিন একটু একটু করে মেরে ফেলা।
অনেক রাতে অফিস থেকে ফিরে ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা ভাত খেয়ে আবার ল্যাপটপ খুলে বসেছি।
অন্যরা যখন ঘুরতে গেছে, আমি তখন ক্যালকুলেটরে হিসাব মিলিয়েছি—
এই মাসে কত টাকা বাঁচালে ডাউন পেমেন্টটা দেওয়া যাবে।
কতদিন নিজের জন্য একটা নতুন ফোন কিনিনি।
কতদিন মায়ের জন্য শাড়ি কিনতে গিয়ে নিজের শার্টটা রেখে দিয়েছি।
কারণ আমি একটা জিনিস চেয়েছিলাম—
নিজের একটা ঠিকানা।
যেদিন বাড়ির কাগজে সই করলাম, সেদিন বাসার ভেতরে ঢুকে আনন্দ করিনি।
গাড়ির ভেতরে বসে ছিলাম অনেকক্ষণ।
স্টিয়ারিংয়ে মাথা রেখে কেঁদেছিলাম।
কারণ জীবনে প্রথমবার মনে হয়েছিল—
এই পৃথিবীতে একটা জিনিস আছে, যেটা সত্যিই আমার।
আমার ঘর।
আমার ছাদ।
আমার পরিশ্রম।
কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন নিজের মধ্যে রাখতে পারিনি।
দেড় বছর পর এক সন্ধ্যায় আমার ছোট বোন তানিয়া ফোন করল।
ওর গলা কাঁপছিল।
বলল,
— ভাইয়া… আমরা একটু সমস্যায় আছি।
তানিয়া, তার স্বামী রিফাত আর তাদের আট বছরের ছেলে রিদম তখন ভাড়া বাসায় থাকত।
শুনলাম, রিফাতের ব্যবসায় বড় লস হয়েছে।
বাড়িভাড়া বাকি পড়েছে কয়েক মাস।
বাড়িওয়ালা নাকি আর সময় দিতে রাজি না।
তানিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,
— কয়েকটা সপ্তাহের জন্য যদি তোমার কাছে থাকতে দাও…
আমি একটুও ভাবিনি।
শুধু বলেছিলাম,
— তোরা চলে আয়।
সেদিন তানিয়া আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিল।
বলেছিল,
— ভাইয়া, আল্লাহর কসম… আমরা তোমার উপর বোঝা হব না।
কিন্তু মানুষের মুখের কথা আর সময়ের আচরণ এক না।
ছয় সপ্তাহ কেমন করে যেন আট মাস হয়ে গেল।
প্রথমদিকে কিছু বলিনি।
ভাবতাম, মানুষ বিপদে পড়তেই পারে।
কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করলাম—
ওরা আর নিজেদের অতিথি ভাবছে না।
রিফাত প্রথম দুই মাস চাকরি খুঁজল।
তারপর একসময় বলা শুরু করল,
— দেশের অবস্থা খারাপ… কাজকর্ম নাই।
কিন্তু আশ্চর্যভাবে, সারাদিন মোবাইলে ভিডিও দেখতে তার কোনো সমস্যা হতো না।
তানিয়া আস্তে আস্তে আমার রান্নাঘর নিজের মতো সাজিয়ে ফেলল।
আমার জিনিস কোথায় রাখব, সেটাও যেন ও ঠিক করত।
রিদম ড্রয়িংরুমটাকে নিজের খেলার ঘর বানিয়ে ফেলেছিল।
সোফার উপর চিপস, মেঝেতে খেলনা, দেয়ালের পাশে স্কুলব্যাগ ছুঁড়ে রাখা।
প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে আমি যেন নিজের বাড়িতে না, অন্য কারও সংসারে ঢুকতাম।
ফ্রিজ ভরে বাজার করতাম, দুই দিনেই খালি।
বিদ্যুৎ বিল বেড়ে গেল।
গ্যাস বিল বেড়ে গেল।
ইন্টারনেট বিল পর্যন্ত দ্বিগুণ হয়ে গেল।
তবুও আমি চুপ ছিলাম।
কারণ ছোটবেলা থেকে একটা কথাই শিখেছি—
পরিবারের মানুষকে বিপদে ফেলে দেওয়া যায় না।
কিন্তু কেউ আমাকে শেখায়নি,
একসময় সাহায্য করতে করতে মানুষ নিজের ঘরেই অচেনা হয়ে যায়।
সেদিন বৃহস্পতিবার ছিল।
অক্টোবরের শেষ দিক।
সারাদিন অফিসে প্রচণ্ড চাপ গেছে।
মাথা ঝিমঝিম করছিল।
তারপরও বাসায় ফেরার আগে বাজারে ঢুকলাম।
তানিয়া মেসেজ করেছিল—
“ভাইয়া, ফেরার সময় ডিটারজেন্ট নিয়ে আসবা।”
একটা “প্লিজ” পর্যন্ত ছিল না।
আমি দুধ কিনলাম, ডিম কিনলাম, রিদমের জন্য আপেল কিনলাম, বাসার আরও কিছু জিনিস কিনলাম।
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি।
সেই ধরনের বৃষ্টি, যেটা জামার কলার ভিজিয়ে শরীরের ভেতর পর্যন্ত ঠান্ডা ঢুকিয়ে দেয়।
কোনোমতে সব ব্যাগ হাতে নিয়ে গেট খুললাম।
মাথা তখন অফিসের টেনশনে ভর্তি।
সামনের সিঁড়িটার দিকে খেয়াল করিনি।
বৃষ্টির পানিতে পিচ্ছিল হয়ে ছিল।
হঠাৎ করেই পা পিছলে গেল।
তারপর শুধু একটা বিকট শব্দ।
ধপ!
মুহূর্তের মধ্যে আমি মাটিতে পড়ে গেলাম।
ডান পায়ের গোড়ালিতে এমন একটা মোচড় খেল, মনে হলো হাড় ভেঙে গেছে।
হাত থেকে বাজারের ব্যাগ ছিটকে পড়ল।
ডিম গড়িয়ে ভেঙে গেল।
দুধের প্যাকেট ফেটে সাদা পানি মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।
বৃষ্টির পানি এসে সবকিছু মিশিয়ে দিচ্ছিল।
আমি উঠতে গেলাম।
পারলাম না।
গোড়ালির ভেতর থেকে এমন ব্যথা উঠল, চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল।
দাঁত চেপে চিৎকার করলাম,
— তানিয়া!
ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই।
শুধু বৃষ্টির শব্দ।
আর দূর থেকে টিভির আওয়াজ।
আবার ডাকলাম,
— তানিয়া! দরজা খোলো!
হঠাৎ পর্দা একটু নড়ল।
আমি পরিষ্কার দেখলাম—
ভেতর থেকে কেউ একজন তাকিয়ে আবার সরে গেল।
তারপর ভেসে এল রিফাতের হাসির শব্দ।
স্বাভাবিক।
নিশ্চিন্ত।
যেন পৃথিবীতে কিছুই ঘটেনি।
আমি এবার কষ্ট করে আরও জোরে বললাম,
— কেউ আসো… আমি উঠতে পারছি না!
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল।
তানিয়া বের হলো।
গায়ে গরম সোয়েটার, হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ।
আমার দিকে তাকাল।
তারপর ভাঙা ডিমের দিকে তাকাল।
আর প্রথম যে কথাটা বলল—
— সব ডিম ভেঙে ফেলছো?
আমি কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়েই রইলাম।
বৃষ্টির পানি চোখ বেয়ে পড়ছিল।
আমি কষ্টে বললাম,
— মনে হয় পা খুব খারাপভাবে মচকে গেছে… একটু ধর তো।
পেছন থেকে রিফাত বের হলো।
মুখে কিছু চিবুচ্ছিল।
সে বিরক্ত গলায় বলল,
— তুমি নিজে উঠতে পারতেছো না?
রিদমও করিডোর থেকে উঁকি দিল।
আমাকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে আবার ফোনে চোখ নামিয়ে ফেলল।
আমি উঠে বসার চেষ্টা করতেই বুক ফেটে একটা গোঙানি বের হয়ে গেল।
বললাম,
— প্লিজ… একটু সাহায্য করো।
তানিয়ার মুখটা কেমন বিরক্ত হয়ে গেল।
যেন আমার এই অবস্থাটা ওর সন্ধ্যাটাকে নষ্ট করে দিয়েছে।
সে ঠান্ডা গলায় বলল,
— ভাইয়া, তুমি সবকিছু নিয়ে বেশি ড্রামা করো।
আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
বললাম,
— ড্রামা?
তানিয়া এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— আমরা কি তোমার চাকর নাকি?
কথাটা শুনে মনে হলো, বৃষ্টির চেয়েও ঠান্ডা কিছু আমার বুকের ভেতর ঢুকে গেল।
আমি চুপ করে তাকিয়ে ছিলাম ওর দিকে।
এই সেই মেয়েটা…
যাকে স্কুলে কেউ কিছু বললে আমি মারামারি পর্যন্ত করেছি।
এই সেই বোন…
যাকে না বলতে পারিনি কোনোদিন।
যে আজ আমার বাড়িতে থাকে।
আমার টাকায় খায়।
আমার বিদ্যুৎ ব্যবহার করে।
আমার ঘর দখল করে বসে আছে।
আর সেই মানুষটাই বলছে—
“আমরা কি তোমার চাকর নাকি?”
আমি তখন মাটিতে পড়ে আছি।
নিজের বাড়ির সামনে।
নিজের কেনা বাজার চারপাশে ছড়িয়ে আছে।
আর আমার পরিবার আমাকে এমনভাবে দেখছে, যেন আমি তাদের জন্য বিরক্তিকর একটা ঝামেলা।
সেই মুহূর্তে আমার ভেতরে কিছু একটা বদলে গেল।
ভালোবাসা না।
অপরাধবোধ।
এতদিন মনে হতো, ওদের কিছু বললে আমি খারাপ ভাই হয়ে যাব।
সেদিন প্রথমবার মনে হলো—
মানুষকে সাহায্য করতে গিয়ে আমি নিজেকেই শেষ করে ফেলেছি।
কাঁপা হাতে পকেট থেকে ফোন বের করলাম।
পাশের গলির আবু কাকাকে ফোন দিলাম।
তিনি আমাদের পুরোনো প্রতিবেশী।
ফোন ধরেই বললেন,
— কী হয়েছে বাবা?
আমি কষ্টে বললাম,
— কাকা… আমি দরজার সামনে পড়ে গেছি। মনে হয় পা ভেঙে গেছে।
তিনি আর কিছু জিজ্ঞেস করেননি।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ছাতা মাথায় দৌড়ে চলে এলেন।
আমাকে সেই অবস্থায় দেখে তার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
বললেন,
— নড়বি না, আমি ধরছি।
তিনি খুব সাবধানে আমাকে উঠালেন।
যেভাবে আপন মানুষ ধরে।
আমাকে ভেতরে এনে সোফায় বসালেন।
একটা বালিশ এনে পায়ের নিচে দিলেন।
তারপর নিজেই অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করলেন।
আর আমি শুধু তাকিয়ে ছিলাম।
তানিয়া, রিফাত আর রিদম তখনও টিভির সামনে বসে।
কেউ “সরি” পর্যন্ত বলল না।
কেউ উঠে এক গ্লাস পানিও দিল না।
রিফাত শুধু নিচু গলায় বলল,
— এত বাড়াবাড়ির কী আছে বুঝি না।
সেদিন আমি বুঝেছিলাম—
সমস্যা কখনো ওদের অসহায় হওয়া ছিল না।
সমস্যা ছিল, ওরা আমার দয়াটাকেই নিজেদের অধিকার ভেবে বসেছিল।
আমি ধীরে ধীরে মাথা তুললাম।
গোড়ালিতে তখনও অসহ্য ব্যথা।
ভেজা কাপড় থেকে পানি পড়ছে।
তবুও আমার গলা অদ্ভুত শান্ত ছিল।
খুব শান্ত।
আমি তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বললাম—
— তানিয়া… ভালো করে আমার কথা শোন।
চলবে…
#অচেন