মালিবাগে চল্লিশোর্ধ্ব এক মহিলা মহিলা নাকি চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়সী এক ছেলের সাথে তার সে ক্স ভিডিও ভাইরাল হওয়াতে সুইসাইড করেছে।লাশ এখনো সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলছে।সাজু সাহেব,গাড়ি বের করতে বলুন দ্রুত।
নীল রঙা পুলিশের গাড়িটা সালাম ম্যানশনের সামনে এসে থেমেছে।বাড়ির নিচে শ’ খানেক মানুষের ভিড়। পুলিশ অফিসার মোস্তাক আহমেদ সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে এসেছে,পিছনে দুজন নারী পুলিশ সদস্যসহ আরো তিনজন। মোট ছয়জনের এক টিম।
মহিলার স্বামী তার সেভেন আর নাইনে পড়ুয়া মেয়ে দুটোকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে।মেয়ে দুটো গুঙিয়ে গুঙিয়ে সমানতালে কেঁদে চলেছে।উচ্চ-মধ্যবিত্তর ছাপ রয়েছে সারা ঘর জুড়ে। দেয়াল জুড়ে বেশ কটা ফ্যামিলি ফটো। তিনটা মেয়েকে মাঝে রেখে একপাশে বাবা আর অন্যপাশ সদ্য সুইসাইড করা মা।
গোলাপি রঙা জর্জেটের শাড়ির বেশ খানিকটা অংশ সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায়।মহিলার মেদহীন পেট, স্লিভলেস ব্লাউজ বলে দেয় এই বয়সে এসেও তিনি শরীরের সাথে বিন্দুমাত্র আপোষ করেননি। মিস নূপুর, ডেড বডি নামাবার ব্যবস্থা করুন।মোস্তাকের কমান্ড শোনা মাত্রই নূপুর সহ বাকি টিম ডেড বডি নামাতে শুরু করে।
আপনি এই ফ্যামিলির কে হোন? পান চিবুতে চিবুতে হঠাৎ করে কেঁদে ওঠা মহিলা দাঁত মুখ শক্ত করে বলল,আমি নিচেরতলার খালাগো রান্ধনে কাম করি।ঐ যে সাদা শার্ট পরা বেডারে দেহেন,হে অইলো ঝুমুর ভাবীর বড় ভাই।মোস্তাকের বুঝে নিতে কষ্ট হয়না ডেড বডির নাম ঝুমুর।
আচ্ছা এই বাসার কোন কাজের লোক নেই?
– হ আছে তো।হের মেয়ের বাচ্চা হইছে কালকা।তাই আহেনাই।
মোস্তাক কথা না বাড়িয়ে সাদা শার্ট পরা ভদ্রলোকের কাছে এসে দাঁড়ায়।ভদ্রলোক অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কেঁদে চলেছে। ভদ্রলোকের ফোন বেশ কয়েকবার বেজে উঠেছে, কান্নার কারণে ভদ্রলোক সেটা টের পাচ্ছেন না।মোস্তাক অপেক্ষা করছে কখন ভদ্রলোক ফোন ধরে। হ্যাঁ,মিনিট খানেক পরেই ভদ্রলোক ফোন ধরে কাঁদতে কাঁদতে কাকে যেন বলছে, আমার বোনকে ওরা মেরে ঝুলিয়ে রেখেছে গো ভাই….ও ভাইইইই।ভদ্রলোক আবার কান্না শুরু করে দিয়েছে।মোস্তাক আর তার টিম ডেড বডি নিয়ে চলে এলো।
পোস্টমর্টেমে প্রত্যাশিত রিপোর্ট-ই এসেছে।অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া যায়নি।গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল ঝুমুরকে তার স্বামী মেরে ঝুলিয়ে রেখেছে কিন্তু পোস্টমর্টেমে ডেড বডির শরীরে কোন স্পট পাওয়া যায়নি।গলায় যে দাগ পাওয়া গেছে সেটা শাড়ির ই।
সপ্তাহ খানেক পর পুনরায় মোস্তাক আহমেদ কিছু প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর খুঁজতে শুরু করেছেন।
আপনার নাম কি?
– সোবাহান৷
আপনি ঝুমুরের কি হোন?
-বড় ভাই।
আপনি বলছেন আপনার বোনকে মেরে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে।অথচ তখন ঝুমুরের স্বামী নাজমুল তখন অফিসে।বাসায় ছিল আপনার দুই ভাগনী।তাহলে আপনি কিভাবে দোষ দিচ্ছেন?
-নাজমুল একটা আস্ত শুয়ারের বাচ্চা,ও আমার বোনকে মেরে এখন অফিসের দোহাই দিচ্ছে।
নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন,মার্জিত ভাবে কথা বলার চেষ্টা করুন।
-স্যার..ঐ নাজমুল ই আমার বোনকে মেরে ফেলে সুইসাইডের নাটক সাজাচ্ছে।
সোবাহান সাহেব বেশ খানিক্ষন কেঁদে কিছুটা শান্ত হয়ে,কান্নারত গলায় আবার বলল,
আমার বোনের গায়ে প্রায়ই হাত তুলত ও।আমার বোন বেশ কয়েকবার আমার বাড়িতে চলে এসেছে ওর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে।ওসব ভিডিও টিডিও নাজমুল অন্য কাউকে টাকা দিয়ে বানিয়েছে যাতে সবাই আমার বোনকে চরিত্রহীনা ভাবে।
দেখুন সোবাহান সাহেব,নাজমুল তখন অফিসে ছিল।উনার অফিসের প্রতিটা কলিগ,হাজিরা খাতা,উনার ডেস্কের সামনে থাকা সিসিটিভিতে তার প্রমাণ আছে।আর সবচেয়ে বড় প্রমাণ আপনার দুই ভাগনী রিমি আর যুথি।তারাই বলছে তাদের বাবা তখন অফিসে ছিল।আর ভিডিওটা ইডিট করে,গলা কেটে বসানো না।আমাদের আইটি এক্সপার্টরা সেটাই বলছে।
-রিমি আর যুথি! ওরা তো ঐ শয়তানটার মুরিদ।বাপ যা বলে ওরা তাই ই করে।আমার বোন যতবার মার খেয়ে আমার বাড়িতে গেছে কোনবারই ওরা ওদের মায়ের সাথে যায়নি।আমার বোনটা মেয়ে দুটোর টানে শুধু মালিবাগে ফেরত যেত।
মোস্তাক আহমেদ কিছু নোটস রেখে সোবাহান সাহেবকে সেদিনের মত বিদায় দিয়ে দিল।
সাজু, এই সাজু।
সাজু মোস্তাক আহমেদের রুমে তড়িঘড়ি করে ঢুকল।স্যার,আমাকে ডেকেছেন?।
হ্যাঁ,এক কাজ কর।রিমি আর যুথিকে নিয়ে আসো।
সাজু ঘন্টা খানেক পেরোতে না পেরোতেই রিমি আর যুথিকে নিয়ে ঢুকল। সঙ্গে তেইশে পা দেয়া এক যুবতীও এলো।মোস্তাক আহমেদ যুবতীর চোখে চোখ রেখে বলল,আপনাকে ঠিক চিনলাম না।আপনি কে?
-আমি মিম। ওদের বড়বোন।
মোস্তাক আহমেদ বিপর্যস্ত গলায় বলল,হ্যাঁ আপনার কথা শুনেছি।আপনার বিয়ে তো রাজশাহীতে হয়েছে,তাইনা?
-হ্যাঁ
মোস্তাক আহমেদ চোখ ঘুরিয়ে রিমির দিকে চেয়ে বলল,তোমার মা যখন বাবার সাথে ঝগড়া বাঁধিয়ে তোমার মামাদের বাসায় যেত তোমরা দু বোন কেন যেতে না?
রিমি মিমের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেবার অভয় খুঁজছে,রিমি উদভ্রান্তের মত রিমির দিকে তাকিয়ে আছে।মোস্তাক আহমেদ দ্রুত গলায় বলল,উনার দিকে না। আমার দিকে তাকিয়ে বলো,তোমরা দুবোন যেতে না কেন?
-যুথি মাথা নিচু করে বলল,মা নিজের দোষেই আর নিজের সুবিধার জন্যই যেতেন মামাদের ওখানে।আমরা কেন বাবাকে মায়ের দোষে ফেলে যাব?
মোস্তাক আহমেদ ঠিক এই সন্দেহটাই করছিলো।কথোপকথন পর্ব সহজ করতে সাজুকে দিয়ে জুস,আর কেক আনিয়ে রাখা হয়েছে।এক স্লাইস কেক মোস্তাক আহমেদ মুখে পুরে নিয়ে বলল,তোমরাও নাও।তিনবোনের কেউ-ই নিল না।
মোস্তাক আহমেদ পানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল,আচ্ছা রিমি তুমি বলো তো তোমার মা কেন মামার বাড়িতে যেত? কিসের জন্য যেত? দোষটাই বা কি?
রিমি আবারো মিমের দিকে তাকালো।মিম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, আসলে মায়ের একজনের সাথে অবৈধ সম্পর্ক চলছিল।যেটা নিয়ে বাবার সাথে প্রায় ঝগড়া হতো, মা আসলে ঝগড়া বাঁধানোর জন্য লেগেই থাকতেন।ঝগড়া বাঁধাতে পারলে মামাদের ওখানে চলে যেতেন তাতে ঐ ছেলেটার সাথে মিশতে সুবিধা হত তার। গত ছ মাস ধরে মাকে কম বোঝাইনি আমরা।তিনি নেশাখোরদের মত যাচ্ছেতাই ব্যবহার করতেন।বাবা সহ্য করতে পারতেন না।আমাদের দিকে চেয়ে সহ্য করে নিচ্ছেন কিন্তু কি থেকে যে কি হয়ে গেল! মিম এটুকু বলেই কেঁদে ফেলল।
মোস্তাক আহমেদ মিমকে শান্ত করে সামনের দিকে ঝুঁকে এসে বলল,ছেলেটা কি ভিডিওর সেই ছেলেটাই?
যুথি উত্তরে মাথা নিচু করে বলল, ‘হুঁ”
আচ্ছা,তোমরা আজ আসো।প্রয়োজনে তোমাদের বাবার সাথে আবার তোমাদের আসতে হতে পারে।
সাজু চেয়ারে বসতে বসতে বলল,স্যার মেয়েদের আর তার বাবার কথার সাথে মিল আছে।মহিলা যে অবৈধ সম্পর্কে জড়িত ছিল এর প্রমাণও আমাদের হাতে আছে।ছেলেটার খোঁজ চলছে। কেসের শেষ দেখছেন না আপনি?
মোস্তাক আহমেদ চোখ বুজেই বললো,হ্যাঁ তা দেখছি।ছেলেটাকে ধরতে পারলেই কেস উইল বি ক্লোজড। মোস্তাক সাহেব চোখ মেলে বললো,ছেলেটাকে ধরার ত্রুটি রাখবেন না।সব থানায় ছেলেটার ছবি পাঠিয়ে দিন।
ভাবা হচ্ছিল ছেলেটাকে ধরলেই কেস ক্লোজ হয়ে যাবে।কিন্তু না,ঘটনা সপ্তাহ তিনেক পেরোতেই অন্যদিকে মোড় নিল। বিজয় স্বরণীতে উবারের গাড়িতেই মিম মারা গেল।পোস্টমর্টেমে জানা গেল মিমের মৃত্যু হয়েছে বিষাক্ত বিষে। উবার ড্রাইভারের ভাষ্যমতে জ্যামে আটকে থাকার সময় মিম রুমাল কেনে। জ্যাম ছাড়ার পরও মিমকে ফোনে কথা বলতে দেখা গেছে।কাওরান বাজারের জ্যামে এসে ড্রাইভার সামনের গ্লাসে দেখে মিমের মুখ দিয়ে নীল লালা বের হচ্ছে।জ্যাম ছাড়া মাত্রই গাড়ি বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে নেয়া হলে ডাক্তার মিমকে মৃত বলে ঘোষণা করে।
মোস্তাক আহমেদকে মিমের বাবা নাজুল খবর দেবার পর।শাহবাগ থানার সাথে সে মিমের মৃত্যুর ব্যাপারটা খতিয়ে দেখছে। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে,এত সুন্দর নকশা করা মনকাড়া রুমাল ঢাকা শহরের রাস্তায় বিক্রি করার কথা না।বিজয় স্বরণীর সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে দশ-এগারো বছর বয়সী এক কিশোরীর কাছ থেকে বিশ টাকায় এই রুমাল কিনেছে মিম।বিস্ময়ের জন্ম দিয়ে মেয়েটার বাঁ হাতে থাকা রুমালগুলো খোলা থাকলেও মিমকে দেয়া রুমালটা পলিথিনের ছোট প্যাকেটে মোড়া ছিল।
মোস্তাক আহমেদ ফ্যাশন ডিজাইনে কাজ করা কয়েকজনকে ডেকে পাঠিয়েছিল এমন নকশা কারা করে সেটা জানার জন্য।দুর্ভাগ্য বশত কেউ ই এর আগে এমন মনকাড়া, সুন্দর নকশা করা রুমাল দেখেনি।তারা এ ব্যাপারে কোন সাহায্যে করতে পারছেনা বলে দুঃখ প্রকাশ করল।
সিসিটিভি ফুটেজে পাওয়া ছবি থেকে রুমাল বিক্রি করা কিশোরীর খোঁজ চলছে।
চলবে….
পর্বঃ০১
গল্পঃ রুমাল
লিখেছেনঃBorhan uddin
গল্পঃরুমাল
মালিবাগে চল্লিশোর্ধ্ব যে মহিলা চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়সী এক ছেলের সাথে তার সেক্স ভিডিও ভাইরাল হওয়াতে সুইসাইড করেছিল তার মেয়েও নাকি রুমাল মাখা বিষে মারা গেছে?
-জ্বি স্যার। আমরা অনেকটা এগিয়ে গিয়েছি।দ্রুত আপডেট জানাবো আপনাকে।
মোস্তাক সাহেব,আপনার প্রতি ভরসা আছে।মেয়েটার মামা শ্বশুর আমার বন্ধু। দ্রুত কিছু একটা করুন নাহলে মুখ দেখাতে পারবোনা। উর্ধতন পুলিশ অফিসার সাকলাইন মাহমুদ হতাশ গলায় এটুকু বলেই ফোন রেখে দিলেন।
স্যার, আসব?
-হ্যাঁ আসো।আচ্ছা সাজু, রুমাল বিক্রি করা মেয়েটার খোঁজ পেলে বললে,তাকে আনতে ফোর্স পাঠাওনি?
জ্বী স্যার।ফোর্স পাঠানো হয়েছে।মেয়েটা ভাষানটেক থাকে। ট্রাফিক পুলিশ বললো মেয়েটা অনেকদিন থেকেই ফার্মগেট, বিজয় স্বরণী,জাহাঙ্গীর গেটের দিকে রুমাল বিক্রি করে।
-মেয়েটাকে ধরতে পারলে যদি কিছু বের করা যায়।ছেলেটার খবর কি? লাস্ট আপডেট জানো?
ছেলেটার ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে পড়ত। নাম রাশেদ।চার সেমিস্টার পেরোনোর আগেই ভার্সিটি কতৃপক্ষ তাকে ভার্সিটি থেকে বের করে দেয়। ছেলেটা এর আগেও নাকি বেশ কিছু মেয়ের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল প্রেমের ফাঁদে ফেলে।কিছু মেয়ের কাছ থেকে নাকি মাস ছয়েক আগেও তাদের সাথে কাটানো অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ফাঁস করে দেবার ভয় দেখিয়ে টাকা নিচ্ছিল।তবে শেষ ছয় মাস ধরে ছেলেটার খোঁজ কেউ জানেনা।শোনা যায় ছেলেটা প্রায় মিশর,সৌদি আরব,তুরস্কে আসা যাওয়া করে।যদিও দেশে নাকি বছরের বেশি সময় থাকলেও সে কোথায় থাকে তার হদিস কেউ দিতে পারলোনা।
-ছেলেটার ফ্যামিলি মেম্বার কে বা কারা কিংবা কোথায় থাকে এই ব্যাপারে কিছু জানলে?
ছেলেটার মা নাকি মধ্যপ্রাচ্যে থাকে। বাবা নেই।
-মোস্তাক আহমেদ খানিক্ষন ভেবে ঠান্ডা গলায় বললো, ধরে নিলাম ছেলেটা টাকার লোভে ঝুমুরের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছিল। এটাও ধরে নিলাম সেক্স ভিডিওটা সে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের জন্য করেছিল কিন্তু ঝুমুরের মেয়ে মিম! তাকে খুন করল কে? দুটো কেসকে আলাদা মনে হচ্ছে। আবার দুটো কেসেরই যোগসূত্রতা আছে বলে মনে হচ্ছে।কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল সব পরিষ্কার হবে রুমাল বিক্রি করা মেয়েটা আর রাশেদকে ধরলে।
স্যার,আমারা যদি ধরে নিই রাশেদ নামের ছেলেটার সাথে নাজমুল সাহেবের ফ্যামিলির কোন পূর্ব শত্রুতা আছে তাহলে কি ব্যাপারটা সহজ হয়ে দাঁড়ায় না?
– না নাজমুল সাহেবের ফ্যামিলির কেউ ই রাশেদকে চেনেনা।মিস নূপুরকে পাঠিয়েছি নাজমুল সাহেবের বাড়িতে।মিমের হাজব্যান্ডও সেখানে আছে।খুঁটিনাটি সব ইনফরমেশন জেনে আসতে বলেছি।
সাজু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল এমন সময় মোস্তাক আহমেদের ফোন বেজে উঠল।
হ্যালো, তৌফিক সাহেব।
-স্যার,রুমালে যে বিষ ছিল সেই বিষের অস্তিত্ব আমাদের দেশে নেই।গোটা এশিয়াতেও পাওয়া যায়না বলেই আমি জানি।যতটুকু জানতে পেরেছি এই বিষ মধ্যপ্রাচ্যে পাওয়া যায়। জুহুরু নামের এক সম্রাটের মৃত্যুর পর তার বালিশের কভারে এই বিষের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল।তবে এই বিষের মূল্য অনেক, ছয় ফোটা বিষের জন্য লাখ খানেক টাকা খরচ করতে হয়।
রীতিমতো বিস্ময়কর ব্যাপারস্যাপার! আচ্ছা তৌফিক সাহেব আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। পরে আবার যোগাযোগ করব প্রয়োজনে।
মোস্তাক আহমেদ দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে খানিক্ষন চুপ থেকে বললো,সাজু এই রাশেদই মনে হচ্ছে মিমকে মেরেছে।তৌফিক সাহেব বললেন,যে বিষে মিমকে মারা হয়েছে সেই বিষ মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছে।তোমার দেয়া ইনফরমেশন মোতাবেক রাশেদ প্রায়ই সৌদি, তুরষ্কে যাওয়া আসা করে।আপাতদৃষ্টিতে এই রাশেদ ছাড়া কারো ঘনিষ্ঠতা চোখে পড়ছেনা। এক কাজ করো,এয়ারপোর্টে জানিয়ে দাও রাশেদ নেক্সট কোন ফ্লাইট ফিক্সড করলে আমাদের যেন জানিয়ে দেয়।আর সর্বশেষ রাশেদ যে দেশে গিয়েছিল সেখানকার এয়ারপোর্টে খোঁজ নিয়ে দেখো রাশেদ কোনদিন দেশে ফেরে। আর এয়ারপোর্টে কেউ তাকে রিসিভ করতে গিয়েছিল কিনা।একটু কষ্ট হবে জানি তবে আমাদের দূতাবাস পুরো সাহায্য করবে বলেই বিশ্বাস।
শিওর স্যার।আমি এক্ষুনি খোঁজ লাগাচ্ছি।
সাজু বের হতেই মিস নূপুর মোস্তাক আহমেদের রুমে ঢুকল।
স্যার।ফ্যামিলিটা খুবই ভেঙে পড়েছে।মিমের হাজব্যান্ড দু তিনবার ফিট হয়ে পড়েও গিয়েছিল এর মাঝে।
-বুঝতে পারছি।পরপর দুটো মানুষের এভাবে চলে যাওয়া মেনে নেয়া যায়না।তো কোন ইফেক্টিভ ইনফরমেশন পেলে?
না স্যার তেমন কোন ইনফরমেশন পেলাম না।উনাদের ফ্যামিলির কোন পূর্ব শত্রু নেই।উনাদের কাউকে সন্দেহও হয়না।আচ্ছা স্যার, একটা ব্যাপার কি খটকা লাগছেনা আপনার?
-কোন ব্যাপারটা?
এইযে,মিমের কাছে কোন পানির বোতল ছিল না।সে চাইলে পানির বোতল কিনতে পারতো,বাদাম কিনতে পারতো।এগুলো না কিনে কেন সে রুমাল কিনতে গেল? যদিও তার ব্যাগে ব্রান্ডের টিস্যু ছিল, আবার একটা নীল রঙের রুমালও ছিল তবুও কেন সে অন্য একটা রুমাল কিনতে গেল?
– হ্যাঁ, ভেবেছি।আমার মনে হয় মিমের রুমালের প্রতি ভালো লাগা ছিল। আর এটা কেউ জানতো।তবে কে জানতো সেটাই বড় প্রশ্ন।
স্যার,মিমের ফ্যামিলি বলছে মিমের রুমাল প্রীতি ছিল।আর সূঁচের কাজ করা সুন্দর নকশার রুমালের প্রতি তার দুর্বলতাও ছিল ভীষণ। যে মিমকে খুন করেছে সে এগুলো জেনেই করেছে।
সাজু রুমের বাইরে থেকে বলল,স্যার আসতে পারি?
-হ্যাঁ আসো।
স্যার, রুমাল বিক্রি করা মেয়েটার নাম ইসমা।মেয়েটাকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে সেদিন রাশেদই মেয়েটাকে এক হাজার টাকা দেয়। মিমের গাড়িটা দেখিয়ে দিয়ে ঐ রুমালটা মিমকে দেখিয়ে কিনতে বলে । মেয়েটা নাকি জানতোনা তাতে বিষ মাখানো ছিল।
-বুঝতে পারছিলাম মেয়েটাকে ব্যবহার করা হয়েছে।আচ্ছা সে রাশেদের কোন খোঁজ জানে?
না স্যার।মেয়েটা নাকি সেদিনই প্রথম দেখেছিল রাশেদকে।
-আচ্ছা, তুমি মেয়েটাকে জিজ্ঞাসাবাদ করো।রাশেদের সাথে আর কেউ ছিল কিনা।
আমি করেছি।কিন্তু শুধু রাশেদই ছিল সেদিন।
মাস দুয়েক মিম আর ঝুমুরের কেসটা শ্লথ গতিতে এগোচ্ছিল।রাশেদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।এক বৃষ্টির রাতে বাংলাদেশ বিমান থেকে জানানো হয় রাশেদ পরদিন রাত দশটায় তুরষ্ক যাচ্ছে। এয়ারপোর্ট থেকে রাশেদকে গ্রেফতার করা হয়ে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।
পুলিশ অফিসার শাহরিয়ারের কাঁধে রিমান্ডের দায়িত্ব পড়েছে।মাথার উপর একশ ওয়াটের লাল বাতি জ্বলছে।বিশাল দেহের শাহরিয়ার নির্বিকার ঘেমে চলেছে।রাশেদের চোখেমুখে ভয়ের বিন্দুমাত্র ছাপ নেই।
শাহরিয়ার রাশেদের চোখে চোখ রেখে বললো,প্রথম প্রশ্ন,ঝুমুরের সাথে সেক্স করে সেই ভিডিও ভাইরাল করলি কেন?
-আমি কোন ভিডিও ভাইরাল করিনি।আর আমি বা ঝুমুর কেউ ই ভিডিও করিনি।
মিথ্যা বলবিনা,তুই আগেও অনেক ভিডিও করে নানান মেয়েদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলি।
-হ্যাঁ আমি তা স্বীকার করছি তবে আমি ঝুমুর আর আমার ভিডিওটা করিনি।
শুয়োরের বাচ্চা,তোর পেছন দিয়ে ডিম ভরে দেবো।নখ উপড়ে ফেলবো আর একটা মিথ্যা বললে।
-আপনি খবরদার গালি দেবেন না।একটা কথাও বের করবোনা মুখ থেকে।
শাহরিয়ার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েই সামনে বসা রাশেদের মুখ বরাবর লাথি মেরে ফ্লোরে ফেলে দেয়। রাশেদের নাক থেকে গলগলিয়ে রক্ত ঝরছে।ঠোঁটের খানিকিটা কেটে গেছে। সেলের বাইরে থাকা জাহেদ মিয়া শাহরিয়ারের ইশারায় রাশেদকে চেয়ারসহ ফ্লোর থেকে তুলে উঠিয়েছে। রাশেদের নাক,ঠোঁট থেকে রক্ত ঝরেই যাচ্ছে।শাহরিয়ার বেনসন সুইচ ধরিয়ে একনাগাড়ে সিগারেট টেনে জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে রাশেদের ঘাড়ে ছোঁপ দেয়াতে রাশেদ মাগো বলে চিৎকার করে উঠলো। শাহরিয়ার নিজের চেয়ারে বসে শান্ত গলায় বললো, বল ভিডিও কেন ভাইরাল করলি?
রাশেদ কাঁদতে কাঁদতে বললোঃ
-স্যার,সত্যিই আমি ভিডিও ভাইরাল করিনি।এগুলো নিশ্চয়ই জহিরের কাজ।স্যার বিশ্বাস করেন আমি ঝুমুরের কাছ থেকে শুধু সত্তর হাজার টাকা নিয়েছিলাম, আর জহিরের কাছ থেকে দুই লাখ।জহিরই আমাকে বলেছিল ঝুমুরকে বিছানায় নিতে পারলে সে দুই লাখ টাকা দেবে।আমি কখনো এতগুলা টাকা একসাথে পাইনি তাই কাজটা করেছিলাম।ঝুমুরকে প্রেমে ফেলেছিলাম জহিরের কথাতেই,চিটাগং গিয়ে যে হোটেলে ছিলাম সে ব্যবস্থাও জহির করে দিয়েছিল।আমি যখন জিজ্ঞেস করি এতে তার লাভ কি সে উত্তর দেয়নি।বিশ্বাস করেন আমি ভিডিও করিনি সেদিন।এটুকু বলেই রাশেদ আরো জোরে কান্না শুরু করে দিলো।
শাহরিয়ার খানিক্ষন কি যেন ভাবল। মিনারেল ওয়াটারের বোতলে মুখ লাগিয়ে ঢকঢক করে অর্ধেক পানি শেষ করে রাশেদের চোখের দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো, মিমকে কেন মারলি?
-রাশেদ এবার কান্না থামিয়ে বললো,মিমকে আমি কেন মারবো! স্যার কি বলছেন এইসব!
শাহরিয়ার ক্ষ্যাপা ষাড়ের মত রাশেদের দিকে ঝুঁকে এসে বললো,শুয়োরের বাচ্চা একদম নাটক করবিনা।মিমকে রুমালে বিষ মাখিয়ে মারিস নাই তুই? ইসমার কাছে রুমাল দিস নাই তুই?
– আমি তো শুধু রুমাল ই দিয়েছিলাম। বিষ দিব কেন! স্যার বিশ্বাস করেন আমি এই খুন,ভিডিও ভাইরালের কিচ্ছু জানিনা।আমাকে জহিরই বলেছিল আমি যদি মিমের কাছে কোনভাবে এই রুমালটা পৌঁছে দিতে পারি তবে আরো দু লক্ষ টাকা দেবে আমাকে।আমি স্রেফ টাকার জন্য কাজ করেছি।খুন করিনি কাউকে, বিশ্বাস করেন স্যার।
নাটক কম কর।ইনফরমেশন আছে তুই তুরষ্ক থেকে আসার চারদিন পরেই মিম খুন হয়।আর যে বিষে তাকে মারা হয় সেই বিষ তুরষ্ক থেকেই এসেছে।তোকে বাঁচানোর কেউ নেই আর।সত্যিসত্যি সব বলে দে সাজা কিছুটা কম পাবি।
-আমি তুরষ্ক থেকে কোন বিষ আনিনি।আনলে এয়ারপোর্টে সেটা আটকা পড়ে যেত,আপনারা এটা তো বিশ্বাস করুন
শাহরিয়ার সেলের বাইরে যেয়ে মোস্তাক আহমেদের সাথে খানিক্ষন কথা বলে আবার সেলের ভেতর ঢুকে রাশেদকে বললো,তুই তুরষ্ক কেন গিয়েছিলি?
-স্যার আমি সব সত্যি স্বীকার করেছি। এখনো সত্যিই বলবো।আমার পাপের শেষ ছিল আমি বুঝিনি,আজ বুঝতে পারছি দ্রুত টাকা কামানোর জন্য কত পাপ করেছি।আসলে জহির জানত আমি প্রায়ই তুরষ্ক মায়ের কাছে যেতাম।আমার মা সৌদি আর তুরষ্কে পাথরের ব্যবসা করেন।
একদিন জহির বললো,তুরষ্ক থেকে ইস্কান্দার নামের একজনকে পনেরোশ ডলার দিয়ে একটা কৌটা নিয়ে আমি যেন তুর্কি এলেমদার পোর্টে পৌঁছে দিই।কৌটার ভেতরে কি ছিল আমি জানতাম না।এখন বুঝতে পারছি ঐ কৌটাতেই বিষ ছিল। দেশে ফেরার পর জহির আমাকে ঠিক সেই কৌটাটা দিয়ে বলে আমি যেন কৌটার সম্পূর্ণ তরলটুকু তার দেয়া রুমালে মাখিয়ে সেটা পলিথিনে মুড়ে মিমের কাছে যেকোনো ভাবে হোক পৌঁছে দিই।মিমকে আমি জহিরের দেয়া ফুটেজ থেকেই চিনেছিলাম।
শাহরিয়ারের কপাল ঘেমে গেছে।শাহরিয়ার রাশেদের চোখের দিকে শান্ত চাহনি দিয়ে বললো,ধরে নিলাম তুই সত্যিই বলছিস।টাকার বিনিময়ে কাজ করেছিস কিন্তু এই জহিরটা কে? একে কোথায় পাবো?
– জহির চিটাগং থাকে।বয়স পঞ্চাশের উপর।প্রায় দেখতাম কার সাথে যেন ফোনে কথা বলতো।বস বস বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলত সেই কলটা আসলেই।যতটুকু বুঝেছি জহিরের সেই বসের নির্দেশেই সে কাজ করতো।
শাহরিয়ার আরেকটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললো,জহিরের ফোন নম্বর আর ঠিকানা দে।
– জহিরের ফোন বন্ধ দুদিন ধরে।আমি তার কাছে লাখ তিনেক টাকা পাবো।সেটাও দেয়নি।আমাকে দুদিন আগে ফোন দিয়ে বললো সময় হলে সে আমাকে ফোন দেবে।আর তার ঠিকানা আমি জানিনা।সে আমার সাথে একেক সময় একেক জায়গায় দেখা করত ।
অপরাধী সত্যি বলছে নাকি মিথ্যে বলছে সেটা বোঝার জন্য বেশ কিছু কৌশল রয়েছে।শাহরিয়ার সেই কৌশল খাটিয়ে বুঝে নিয়েছে রাশেদ যা বলার সত্যিই বলেছে।
রাশেদের দেয়া বর্ণনা অনুযায়ী জহিরের বেশ কিছু পোট্রের্ট আঁকা হয়েছে।নাজমুল সাহেবের ফ্যামিলি, মিমের হাজব্যান্ডকে সে পোট্রের্ট দেখানোর পর তারা বলেছে এমন কাউকে তারা আগে কখনো দেখেনি।
মালিবাগ থানা জহিরের পোট্রের্ট ডিবি কার্যালয় সহ চিটাগং এর বেশ কিছু থানায় পাঠিয়ে দিয়েছে।
চলবে….
পর্বঃ০২
লিখেছেনঃ Borhan uddin
#গল্পঃরুমাল, পর্বঃ০৩
মাস দুয়েক পেরিয়ে যাবার পরেও জহিরের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। তুরস্ক থেকে যে বিষের কৌটা আনা হয়েছিল চট্টগ্রামে সে বিষয়ে খোঁজ চলছে এখনো।শাহরিয়ারের পরিবর্তে রাশেদের রিমান্ডের জন্য দায়িত্ব পড়েছে নতুন পুলিশ অফিসার সাজ্জাদের কাঁধে।
ঝুমুর, মিমের কেস স্টাডি করে সাজ্জাদ দুটো সিদ্ধান্তে পৌঁছাল। রাশেদই মূল হোতা আর সে নানা গল্প বানাচ্ছে নয়তো আড়ালেও কেউ আছে যার ইশারায় রাশেদ কাজ করেছে।
লিকার চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মোস্তাক আহমেদ বলল, তা সাজ্জাদ সাহেব কতদূর এগোলেন?
-রাশেদের কথাগুলো আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।জহিরের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছেনা।সে জহিরের যে নাম্বার দিয়েছে সেটা সুইচড অফ আর নাম্বারটাও এক মৃত ভিক্ষুকের নামে রেজিষ্ট্রেশন করা।যে কিনা মারা গেছে বছর দেড়েক আগেই! আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এই রাশেদই জহির। সে ডাবল ক্যারেক্টর রোল করছে।
হতে পারে জহির নানান অপরাধের সাথে অনেক আগে থেকেই জড়িয়ে আছে তাই নিরাপত্তার খাতিরে ভিক্ষুকের নামেই সিমের রেজিষ্ট্রেশন করেছিল।রাশেদ ধরা পড়াতে সে গা ঢাকা দিয়েছে।এমনটা কি হতে পারেনা?
-পারে স্যার।তবে রাশেদ বলেছে সে স্রেফ টাকার জন্য কাজটা করেছে কিন্তু সৌদি আল রাহ্জি ব্যাংকে তার একাউন্টে ষাট হাজার রিয়াল কেন? আল সাম্বা ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপে তার একাউন্টে চৌষট্টি হাজার রিয়াল কেন? যা কিনা বাংলা টাকায় প্রায় আটাশ লক্ষ টাকার সমান। এছাড়াও ডাচ বাংলা ব্যাংক, লংকা ব্যাংকে তার একাউন্টে প্রায় ছত্রিশ লক্ষ টাকা আছে।এরপরেও কি বিশ্বাস করা যায় সে স্রেফ দু চার লাখ টাকার জন্য ঝুমুর,মিমকে এভাবে মেরে ফেলবে?
মোস্তাক আহমেদ সাজ্জাদের কাজের স্পিরিটের প্রতি মুগ্ধ না হয়ে পারেনা।ধীর গলায় মোস্তাক আহমেদ বলল,হতেও পারে রাশেদের এত টাকার সোর্স নানা ধরনের অপকর্ম। নানা অপরাধে জড়িয়ে দ্রুত টাকা কামিয়েছে।
-তবুও তো প্রশ্ন থেকে যায়। সে টাকার বিনিময়ে কাজটা করলে তো কারো না কারো অর্ডারে কাজটা করেছে। সে বলছে এই অর্ডার জহির দিয়েছে তাকে বাট আনফরচুনেটলি জহিরের কোন অস্তিত্বই পাওয়া যাচ্ছেনা।তাই আমাদের হাতে রাশেদ ছাড়া আর কেউ নেই।
সাজ্জাদ আরো কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল এর মাঝেই মিস নূপুর রুমের বাইরে থেকে ভেতরে ঢোকার পারমিশন চাইলো।মোস্তাক আহমেদের অনুমতিতে মিস নূপুর রুমে ঢুকে একটা পেপার মোস্তাক আহমেদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, স্যার চিটাগং পোর্ট থেকে গতকাল মেইল করে তারা জানিয়েছে গত ছয় মাসে জহির নামে কোন প্রোডাক্ট তাদের কাছে আসেনি।তবে জহির মাল্টিমিডিয়ার নামে সিঙ্গাপুর থেকে ইলেকট্রনিকস প্রোডাক্ট এসেছিল।
মোস্তাক আহমেদ ইমেলের প্রিন্ট আউট কপিতে চোখ বুলাতে বুলাতে বলল,এই জহির সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছেন?
মিস নূপুর বলল, জ্বী স্যার। আমি গতকাল মেইল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই খোঁজ নিয়েছিলাম।এই জহির রাজশাহীর বাসিন্দা,বয়স সাতাশ-আটাশ। আশ্চর্যজনকভাবে মিমের হাজব্যান্ডের বাড়িও রাজশাহীতে।
মোস্তাক আহমেদ খানিকটা নড়েচড়ে বসলেন।
সাজ্জাদ মোস্তাকের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে চোখ বোলাতে বোলাতে বলল,ব্যাপারটা জটিল হয়ে গেলো।রাশেদের দেয়া বর্ণনার জহিরের সাথে এই জহিরের কোন মিল নেই।চিটাগং পোর্ট থেকে বলা হচ্ছে এই জহির কোন কৌটা আনেনি তুরস্ক থেকে বরং এই জহির সিঙ্গাপুর থেকে ইলেকট্রনিকস প্রোডাক্ট এনেছে।এই জহিরের বাড়ি মিমের হাজব্যান্ডের শহরেই, কেসটা মনে হচ্ছে নতুন দিকেই মোড় নিচ্ছে।সাজ্জাদ মোস্তাক আহমেদের দিকে কাগজটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,স্যার মিমের হাজব্যান্ডকে জিজ্ঞাসাবাদের ব্যবস্থা করুন।
রাশেদের চোখের নিচে বেশ কালি জমেছে।খোঁচা দাড়ির বদলে চার আঙুল সমান দাড়ি গজিয়েছে।ফর্সা মুখখানা ঘুষিতে কালচে হয়ে আছে।সাজ্জাদের সামনে এনে বসানো হয়েছে রাশেদকে।
তুই বললি তুই স্রেফ টাকার জন্য কাজটা করেছিলি।তোর দেশে বিদেশে সব মিলিয়ে সত্তর লাখের মত টাকা আছে নানা ব্যাংকে।এই টাকার সোর্স কি?
-রাশেদ ক্লান্ত চোখে সাজ্জাদের দিকে তাকিয়ে বলল,আমার ডাচ বাংলা ব্যাংকে লাখ খানেক টাকা ছিল স্যার।আমার অন্য ব্যাংকের একাউন্ট গুলোতে টাকা ছিল না কোন।স্যার আমার মা সৌদিতে যেয়ে আবার বিয়ে করেছেন।মা শুধু আমার ফ্লাইটের খরচ দেন,আর মাস শেষে কয়েক হাজার রিয়াল হাতে গুঁজে দেন।মায়ের পাথরের ব্যবসার জন্যই তিনি আমাকে ডেকে পাঠান।আসলে আমি যে লাইফ স্টাইল বেছে নিয়েছিলাম সেখানে টাকার দরকার ছিল। তাই নানা সময়ে নানা অন্যায় করে টাকা কামিয়েছি।আপনারা ভাবছেন ঝুমুর, মিমকে আমি নিজ স্বার্থে মেরেছি কিন্তু আমি পুরো কাজটাই টাকার বিনিময়ে করেছিলাম জহিরে অর্ডারে।স্যার খোদার কসম,আমার একাউন্টে লাখ খানেকের বেশি টাকা নেই। আমাকে বিশ্বাস করুন স্যার।স্যার আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ..।রাশেদ এটুকু বলেই কাঁদতে শুরু করে দিল।
সাজ্জাদ টেবিলে সজোরে ঘুষি মেরে বলল,ড্রামা অন্য কোথাও করবি বাস্টার্ড। তুই বলেছিলি জহির চিটাগং পোর্ট থেকে বিষের কৌটা রিসিভ করেছিল।জহিরের বয়স নাকি পঞ্চাশ! তোর দেয়া মিথ্যে বর্ণনায় পোট্রের্ট এঁকে সব থানায় পাঠিয়েছিলাম।তুই জহিরের মিথ্যে পরিচয় আর ভুল ফোন নাম্বার দিলি কেন? জহির তো রাজশাহী থাকে। তার বয়সও সাতাশ-আটাশ। মিথ্যে বললি কেন?
সাজ্জাদ এটুকু বলেই গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে রাশেদের গালে চড় বসিয়ে দেয়।রাশেদ একটুর জন্য চেয়ার থেকে পড়েনা।
রাশেদ গুঙিয়ে কেঁদে ওঠে।সাজ্জাদের ধমকে কান্না থামিয়ে বলল
-স্যার, খোদার কসম আমাকে যে জহির কাজের অর্ডার দিয়েছিল তার বয়স পঞ্চাশের উপর।চাটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলে সে। তার বাড়িও চিটাগং। আর ভুল নাম্বার কেন দিব স্যার! আমার সাথে ঐ নম্বরেই যোগাযোগ করত সে।আর ইস্কান্দারের কাছ থেকে বিষের কৌটাটা নিয়ে আমি নিজেই তুরস্কের এলেমদার পোর্টে পৌঁছে দিয়েছিলাম।আর বাংলাদেশ থেকে সেটা রিসিভ করার কথা ছিল জহিরেরই।আর সেটা জহিরই রিসিভ করেছিল।
সাজ্জাদ সেদিনের মত জিজ্ঞাসাবাদ স্থগিত করে রাজশাহীর সেই জহিরকে মালিবাগ থানায় ডেকে পাঠায়। ঘন্টা তিনেক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নানান প্রশ্নের পর পরিষ্কার হয় এই জহিরের সাথে আসলেই মিমের হাজব্যান্ডের কোন সম্পর্ক নেই।ওদিকে জানা যায় মিমের হাজব্যান্ড মিমের শোকে খাওয়াদাওয়া ছেড়ে, রাত জেগে জেগে অসুস্থ হয়ে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি। মোস্তাক আহমেদ আর মিস নূপুর হাসপাতালে যেয়ে বেশ কদিন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তারা একই সিদ্ধান্তে আসে রাজশাহীর সেই জহিরের সাথে মিমের হাজব্যান্ডের কোন যোগাযোগ কখনো হয়নি।দুজন দুজনকে চেনেওনা।
মোস্তাক আহমেদরা ধরেই নিয়েছিল রাশেদ বানিয়ে তাদের গল্প শুনিয়েছে। রাশেদ হয়তো কোনভাবে ঝুমুর আর মিমের সাথে পরিচিতি ছিল।যেটা ঝুমুরের ফ্যামিলি জানেনা।হয়তো কোন রেষারেষি থেকেই মিমকে খুন করেছে সে।
কিন্তু না। কেসের গতিপথ ঘুরে যায় দিন সাতেক পরেই। দেশের বেশ কয়েকটা জাতীয় পত্রিকায় খবর আসে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জহির নামের পঞ্চাশোর্ধ এক ব্যক্তির গলা কাটা লাশ মিলেছে নদীর ধারে। কোন পত্রিকাই মৃতের মুখের ছবি ছাপায়নি।মোস্তাক আহমেদের ফরমায়েশে চিটাগং পুলিশ ইমেলেই জহিরের গলা কাটা ছবি পাঠিয়েছে।মুখের খানিকটা থেতলে গেলেও মোস্তাক আহমেদের বুঝতে কষ্ট হয়না যে এটাই রাশেদের বর্ণনা দিয়ে আঁকানো পোট্রের্টের সেই পঞ্চাশোর্ধ জহিরই।
সাজ্জাদ,মোস্তাকরা যখন ভাবছিল এই কেসের সর্বশেষ সাক্ষীর মৃত্যুতে কেসটা অন্ধকারে চলে গেছে তখনই তুর্কি পুলিশ থেকে জানানো হলো বাংলাদেশ পুলিশের দেয়া বর্ণনা আর পোট্রের্ট এর সাহায্য নিয়ে তারা ইস্কান্দার নামের এক ব্যক্তিকে ধরেছে। যে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন যাবত বিষের ব্যবসা করে আসছে।
সাজ্জাদ,মোস্তাকদের অবাক করে দিয়ে ইস্কান্দারের বিবৃতিতে বেরিয়ে আসে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। তুর্কি পুলিশ ইমেইল করে জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে অর্ডার আসে রাশেদ নামের এক যুবকের কাছে পনেরোশ ডলারের বিনিময়ে এক কৌটা বিষ যেন সে দেয়। বাংলাদেশ থেকে যে নম্বরে ইস্কান্দারের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল সে নম্বর মালিবাগ থানা থেকে বাংলাদেশ টেলিকমুনিউকেশনে যাবার পর তারা দিন দুয়েক পর জানিয়েছে নম্বরটি কক্সবাজারের হিভেন রিসোর্টের।
মোস্তাক আহমেদের পারমিশনে সাজ্জাদকে রাতের ফ্লাইটেই কক্সবাজার পাঠানো হয়েছে।
ভোর রাত থেকেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে।সাজ্জাদ সি প্যালেস নামের ফাইভ স্টার হোটেলে এসে উঠেছে।বেলকনির সামনের অংশ মস্ত গ্লাসে ঢাকা।স্বচ্ছ গ্লাসের উপর বৃষ্টির পানি এসে পড়ছে।বেলকনি থেকেই সামনে উত্তাল সমুদ্র।বৃষ্টি কমে আসবে এই আশাতে সাজ্জাদ অপেক্ষা করছে।ঘন্টাখানেক পরে বৃষ্টি থেমে সূর্য উঠেছে।সূর্যের মিহি আলোতে বাইরে বেরিয়ে আসা মাত্রই কক্সবাজার পুলিশের গাড়ি দেখতে পেল সাজ্জাদ।মোস্তাক আহমেদ গতকাল রাতেই উর্ধতন পুলিশ অফিসারের সাহায্য চেয়ে রেখেছিলেন।পুলিশের গাড়িতে উঠতেই সাজ্জাদকে ওয়েলকাম জানালো অফিসার আরমান মাহবুব।বৃষ্টিস্নাত পিচঢালা রাস্তায় দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে সাজ্জাদরা।উদ্দেশ্য হিভেন রিসোর্ট।
চলবে…
লিখেছেনঃ Borhan uddin
#রুমাল, পর্বঃ০৪
খবর শুনেছেন? জহিরের গলাকাটা লাশ পাওয়া গেছে মিরসরাইয়ে। শাহরিয়ার খবরের কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে বলল,কি বলেন স্যার! কেস তো তবে জটিল হয়ে গেল।মোস্তাক আহমেদ চেয়ারে বসতে বসতে বললো,হ্যাঁ জটিল হয়েছে আবার কিছুটা খোলসাও হয়েছে।শাহরিয়ার কৌতূহলী চোখে মোস্তাক আহমেদের দিকে তাকিয়ে বললো,খোলসা কিভাবে হল? মোস্তাক আহমেদ তার ড্রয়ার থেকে চিটাগং ফ্লাইটের টিকিট শাহরিয়ারের দিকে বাড়ি দিয়ে বললো,খোলসা হয়েছে কিভাবে সেটা এসে জানবেন।বিকেল চারটা নাগাদ আপনার ফ্লাইট আছে,চিটাগং যাবেন। শাহরিয়ার রোবট কন্ঠে বলল,স্যার এই কেস তো সাজ্জাদ সাহেবের।মোস্তাক আহমেদ শীতল দৃষ্টিতে শাহরিয়ারের চোখে চোখ রেখে বলল,হ্যাঁ সাজ্জাদ দেখছে।সেই সাথে আপনিও দেখবেন। জহিরের বাড়ি চিটাগং এর বদ্দারহাট। আপনি যেহেতু কেসের সাথে আগে থেকেই আছেন তাই চিটাগং পুলিশের সাথে আপনিও জহিরের বাড়িতে যাবেন। দেখেন ওর ফ্যামিলি থেকে কিছু বের করতে পারেন কিনা।অনিচ্ছাসত্ত্বেও শাহরিয়ার চিটাগং এর উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়লো।
হিভেন রিসোর্টের সামনে এসে কক্সবাজার পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়েছে।সৌন্দর্য বর্ধনে পুরো রিসোর্টেটাই রুচিশীল ভাবে সাজানো হয়েছে।আরমান মাহবুব আর সাজ্জাদ বৃষ্টিতে ভেজা দুর্ব ঘাস মাড়িয়ে রিসোর্টে ঢুকে পড়ল।রিসোর্টের কেয়ারটেকার হামিদ দূর থেকে দুজন পুলিশ দেখতে পেয়ে খানিকটা ভয় পেয়ে গিয়েছে।হামিদের কাছে এগিয়ে আরমান বললো, আপনার কাজ কি এখানে? হামিদ ঢোক গিলে বললো,আমি এখনকার কেয়ারটেকার। সাজ্জাদ পালটা প্রশ্ন করলো, ভেতরে রিসোর্টের লোক আছে না? হামিদ নিচু গলায় বললো,জ্বী আছে।
রিসোর্টের ভেতরটা বেশ যত্নের সাথে গোছানো।অভ্যর্থনা ডেস্কে থাকা সুদর্শন জোবায়ের সাজ্জাদদের দেখে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,স্যার আপনাদের কিভাবে সাহায্য করতে পারি? আরমান মাহবুব চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে বললো,আপনাদের এই সিসিটিভি চালু আছে? জোবায়ের কৃত্রিম হাসি দিয়ে বললো,জ্বী স্যার।চব্বিশঘণ্টাই চলে। দেয়ালে টাঙানো এক ভদ্রলোকের ছবির দিকে তাকিয়ে সাজ্জাদ বললো,উনি কে? জোবায়ের আবারো কৃত্রিম হাসি হেসে বললো,উনি এই রিসোর্টের মালিক।সাজ্জাদ পকেট কেটে থেকে একটুকরো কাগজ বের করে জোবায়েরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,এই নাম্বারটি কি আপনাদের রিসোর্টের? জোবায়ের এপর্যায়ে হাসতে ভুলে যায়।নরম গলায় বললো,জ্বী স্যার আমাদেরই তো।
আরমান বললো, এই নাম্বারটা কত নম্বর রুমের? জোবায়ের নাম্বারটা ভালোভাবে দেখে নিয়ে বললো, এটা চার নম্বর রুমের।
সাজ্জাদ ঘড়ির টাইম দেখতে দেখতে বললো,আপনাদের এখানে লাস্ট চার মাসে কে বা কারা এসেছে সেটার ইনফরমেশন নিশ্চয়ই সংগ্রহ করেছেন, তাইনা?
জোবায়ের মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলো।
আরমান জোবায়ের চোখে চোখ রেখে নরম গলায় বললো,আমাদের সেই ইনফরমেশন গুলো লাগবে।
জোবায়েরের যেন উত্তর মুখস্থই ছিল।জোবায়ের বললো,স্যার আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত আমি আপনাদেরকে কোনরকম ইনফরমেশন দিতে পারছিনা বলে। আমাদের রিসোর্টের মালিক আই মিন ফারুক স্যারের পারমিশন ছাড়া আমরা এই ব্যাপারে কোনভাবেই সাহায্য করতে পারবোনা।
আরমান জেলা পুলিশ সুপারকে ফোন দিয়ে বিস্তারিত জানানোর পর।জেলা পুলিশের কার্যালয় থেকে ফারুক সাহেবের সাথে যোগাযোগ করার পর ফারুক সাহেব জানালেন তিনি ঐ মুহূর্তে ঢাকা অবস্থান করছেন। তিনি পরদিন কক্সবাজার ফিরেই নিজে থেকে সাজ্জাদদের সাহায্যে করবেন। পুলিশ সুপার সেদিন পারমিশন দেবার জন্য অনেক অনুরোধ করার পরেও তিনি রাজি হননি।যেহেতু ফারুক সাহেব স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি তাই কোনরকম জোরজবরদস্তি করার সুযোগ না থাকায় সাজ্জাদ,আরমানদের সেদিনের মত ফিরে আসতে হয়।
জহিরের মৃত্যুর পর তার পরিবার তার লাশ নিতে এসেছিল।চিটাগং পুলিশ জহিরের ফ্যামিলি মেম্বারদের বেশ কয়েকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। শাহরিয়ার চিটাগং পুলিশকে সাথে নিয়ে জহিরের বাড়িতে আবার এসেছে
আধপাকা বাড়ির টিনের চালে জং ধরেছে। উঠানে সদ্য ফোটা মুরগীর বাচ্চাগুলো চ্যাও চ্যাও করে মায়ের পিছনে ছুটছে। বারন্দায় আধা থালা মাখানো ভাতে পানি ঢেলে কেউ ফেলে রেখেছে।উঠানের দড়িতে দুটো শাড়ি নেড়ে দেওয়া।শাহরিয়ার উঠান থেকে গলা বাড়িয়ে বললো,কেউ আছেন ভেতরে? বার তিনেক ডাকার পরে ঘরের ভেতর থেকে বাইশ-তেইশ বছরের যুবতী বেরিয়ে এসে বললো, আম্মা বাসায় নাই।হাসপাতালে ভর্তি। শাহরিয়ার বুঝে নিল এ কদিন এ বাড়িতে পুলিশ বেশ আসা যাওয়া করেছে তাই মেয়েটা তাদের দেখা মাত্রই প্রশ্নের আগেই উত্তর দিয়ে দিল।শাহরিয়ার বারান্দায় বসতে বসতে বললো,আপনি জহিরের কি হোন? মেয়েটা ভাতের থালাটা হাতে তুলে নিয়ে বললো,আমি তার মেয়ে।শাহরিয়ার ভণিতা না করেই বললো,আপনার মা যেহেতু নেই সেহেতু আপনার সাথেই কিছু কথা বলতে চাচ্ছি।মেয়েটা শাহরিয়ারের দিকে খানিক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো,আচ্ছা অপেক্ষা করুন আমি আসছি।
মেয়েটা ওড়নায় ভেজা হাত মুছতে মুছতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেই শাহরিয়ারের মুখোমুখি বসে বললো,বলুন কি বলবেন।শাহরিয়ার বললো,আপনার বাবার খুন নিয়ে কাউকে সন্দেহ করেন কি?
-সন্দেহ তো অনেককেই করি।বাস মালিক সমিতির মির্জা সোলাইমানকে করি,পোর্টের ইসান মোল্লারে করি, ঘরের পেছনের যে গ্যারেজ আছে সেখানকার লিয়াকুবরে করি।আসলে আমার আব্বার গ্যাঞ্জাম ফ্যাসাদ লেগেই থাকত মানুষজনের সাথে।
শাহরিয়ার বললো,গ্যাঞ্জাম ফ্যাসাদে কারণ কি ছিল?
-সবার সাথেই টাকা নিয়ে ঝামেলা হতো।আব্বা কাজকর্ম ছেড়ে দিয়েছিল বছর দুয়েক ধরে।যখন জিজ্ঞাসা করতাম কিসের টাকা নিয়ে এত ফ্যাসাদ আব্বা এড়িয়ে যেতেন।
আপনার মাকে বলতো না?
-না।মা আব্বাকে প্রচুর ভয় পেতেন।কখনো আব্বা মাকে বাইরের কোন ব্যাপারে কিছু বলতেন না।যা বলার আমাকেই বলতেন সেটাও অনেক খোঁচানোর পরে
আপনি যাদের নাম বললেন এরা পুলিশের সন্দেহ তালিকায় আছে। এদের নিয়ে ইনভেস্টিগেশন চলছে।এর বাইরেও একজনকে সন্দেহ করা হচ্ছে।তার সম্পর্কে কিছু জানেন কি?
– না আমি জানিনা।পুলিশ বারবার বলছিল রাশেদকে আব্বা কিভাবে চিনতেন।আব্বার বস কে। আসলে রাশেদ নামটাই আমরা আব্বার মৃত্যুর পর প্রথম শুনেছি।আর বসের ব্যাপারটা নিয়ে আমি শুধু জানি প্রায় আব্বাকে এক লোক ফোন দিতেন,আব্বা তাকে বস বলে ডাকতেন।জিজ্ঞেস করার পরেও আব্বা কোনদিন ঐ বস সম্পর্কে কিছুই বলেননি।
ঘন্টাখানেক নানা প্রশ্নের পরেও কোন অথেনটিক ক্লু না পেয়ে যখন শাহরিয়ার জহিরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় চলে আসে তখন জানালা দিয়ে জহিরের মেয়েটা জানালা দিয়ে শাহরিয়ারকে ডেকে বলে,স্যার একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। বাড়ির ভেতরে আসবেন একটু?
জহির উঠানে ঢুকতেই মেয়েটি এগিয়ে এসে বললো, আমাদের ভার্সিটিতে অনেক জায়গার স্টুডেন্ট আছে। অনেকের সাথেই মিশেছি।এক বন্ধু আছে যার বাড়ি যশোরে,তাকে যদি বলি দোস্ত চল ঐখানে যাই সে উত্তরে বলে, “পরে যাবানে” তাকে যদি বলি দোস্ত চল কিছু খাই তাহলে সে উত্তরে বলে, “পরে খাবানে”। আব্বা যখন তার বসের সাথে কথা বলতো প্রায় বলতো,” জ্বী বস আমি যাবানে, আমি করবানে”। আসলে আব্বা উনার সাথে অনেক কথা বলতো,আমার কেন যেন মনে হয় আব্বার বস যশোর, সাতক্ষীরার দিকের মানুষ কিংবা উত্তর- দক্ষিণবঙ্গের। আব্বা আমাদের চাটগাঁইয়া ভাষা ছাড়া কথা বলতে জানতোনা।তবে উনি উনার বসের সাথেই শুধু যাবানে,করবানে বলতো।হয়তো আব্বার বসও এমন বলতো,সেটার অনুকরণ করতো আব্বা।এটা আমার ধারণা, আপনাদের কাজে লাগতে পারে তাই বললাম।
শাহরিয়ার বেশ অভিভূত হয় মেয়েটার কথা শুনে।শাহরিয়ার বললো,কোন সাবজেক্টে পড়ছেন?
-আই আর এ পড়ছি।
শাহরিয়ারের হিসেব আর আন্দাজ দুইয়ে দুইয়ে চার হয়ে যাচ্ছে। শাহরিয়ার ফ্লাইট ধরতে বিমানবন্দরের দিকে এগোতে শুরু করল।
সাজ্জাদ, আরমানকে আধঘন্টা অপেক্ষা করিয়ে ফারুক সাহেব আসলেন তার হিভেন রিসোর্টে। ফারুক সাহেব বসতে বসতে বললেন,আপনাদের অনেক্ষণ বসিয়ে রাখলাম কিছু মনে করবেন না। সাজ্জাদ বিরক্তি নিয়ে বললো,ইটস অকে।পায়ের উপর পা তুলে ফারুক সাহেব বেনসন সিগারেট মুখে নিয়ে লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে বড় করে একটা টান দিয়ে নাক দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন,বলুন আপনাদের কিভাবে সাহায্য করতে পারি? সাজ্জাদ দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সংবরণ করে বললো,কাল কার্যালয় থেকে তো আপনাকে সব জানানো হয়েছিল।ফারুক সাহেব দু ঠোঁট সরু করে ধোঁয়া ছেড়ে কপাল কুঁচকে বললেন,কি যেন বলেছিল? ভুলেই গেছি এই দেখেন! এটুকু বলেই ফারুক সাহেব হো হো করে হেসে উঠলেন।আরমান মাহবুব বিনীত গলায় বললো, আমরা জানুয়ারির বিশ থেকে সাতাশ তারিখের সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চাই সেই সাথে ঐ কয়দিন কে বা কারা রিসোর্টে ছিল তার ইনফরমেশন চাচ্ছি।
ফারুক সাহেব সিগারেটের শেষ টানটা চোখ বুজে দিলেন।চোখ বুজেই কি যেন খানিক্ষণ ভাবলেন।চোখ মেলে জোবায়েরে দিকে তাকিয়ে বললেন, আমারা তো শুধুমাত্র চলতি মাসের সিসিটিভির ফুটেজ রাখি তাইনা? জোবায়ের মাথা নাড়িয়ে বললো,জ্বী স্যার।ফারুক সাহেব উঠতে উঠতে বললেন,সরি ম্যান সিসিটিভি ফুটেজ এই মাসেরই পাবেন।আর কারা এসেছিল এই ইনফরমেশন গত তিনবছরেরটাও পাবেন।ফারুক সাহেব জোবায়েরের দিকে তাকিয়ে বললেন,জোবায়ের তুমি উনাদের এই ইনফরমেশনটা দিয়ে দিও।আমার চেম্বার অব কমার্সের মিটিং আছে আজ।সাজ্জাদ আর আরমানকে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বেরিয়ে গেলেন তিনি।
ঘন্টা দেড়েক খোঁজাখুঁজির পর জানুয়ারির তেইশ তারিখে চার নম্বর রুমে যে মানুষটা ছিল তার নাম, সিগনেচার,আর স্থায়ী ঠিকানার জায়গায় রাজশাহী নামটা দেখতে মোটেও প্রস্তু ছিল না সাজ্জাদ।মিমের হাজব্যান্ড ইমতিয়াজ ছিল সেদিন চার নম্বর রুমে! সে ই তবে টেলিফোন করেছিল ইস্কান্দারকে! সাজ্জাদ দ্রুত মোস্তাক আহমেদকে ফোন দিয়ে সবটা জানিয়ে দিল। ইমতিয়াজের এন্ট্রি নেয়ার ডকুমেন্ট পেপারের ছবি তুলে নূপুরকে মেইল করে দিয়ে সন্ধ্যার ফ্লাইটেই ঢাকা ফিরে আসলো সাজ্জাদ।
শাহরিয়ারের পাঠানো ইনফরমেশনে বলা হচ্ছে এই কেসের মূল হোতা উত্তর-দক্ষিণবঙ্গের কেউ। যেহেতু এই কেসের সাথে যতজন সন্দেহ তালিকায় আছে তাদের ভেতর মিমের হাজব্যান্ড ই একমাত্র উত্তর-দক্ষিণবঙ্গের তাই আঙুলটা তার দিকেই ওঠে।আর সাজ্জাদের পাঠানো তথ্যতে নিশ্চিত হওয়া গেছে জানুয়ারির তেইশ তারিখে হিভেন রিসোর্টে সেদিন ইমতিয়াজ ই ছিল।ইস্কান্দারকে ফোন কলের তারিখটাও মিলে গিয়েছে।
যাবতীয় প্রমাণ হাতে পেয়ে মিমের হাজব্যান্ড ইমতিয়াজকে গ্রেফতার করে আনা হয়েছে সেন্ট্রাল হাসপাতাল থেকে।
মিমের হাজব্যান্ডকে থানায় ধরে আনার পরদিনই মিমের বাবা নাজমুল,মিমের দুই বোন রিমি যুথি আর ইমতিয়াজের বাবা থানায় ছুটে এসেছে।
মোস্তাক আহমেদকে অবাক করে দিয়ে নাজমুল সাহেব বললো,আপনারা ভুল করে আমার মেয়ের জামাইকে ধরে এনেছেন।ইমতিয়াজের বাবা অনুনয়ের সুরে মোস্তাক আহমেদকে বললো,আমার ছেলে কেন আমার বৌমাকে মারতে যাবে! আপনাদের ভুল হয়েছে স্যার।
মোস্তাক আহমেদ নির্ভার সুরে বললো,আমাদের হাতে প্রমাণ আছে।প্রমাণ ছাড়া ধরিনি।
নাজমুল সাহেব খানিকটা বিচলিত হয়ে বললো,কি প্রমাণ আছে আপনাদের হাতে?
মোস্তাক আহমেদ ইমতিয়াজের বাবার দিকে হিভেন রিসোর্টের সেই এন্ট্রির পেপারটা দেখিয়ে বললো,এটা আপনার ছেলের সিগনেচার না?
ইমতিয়াজের বাবা একবার চোখ বুলিয়েই বললো,হ্যাঁ এটা তো ইমতিয়াজের সিগনেচার ই।তা এটা কিসের প্রমাণ? ।
মোস্তাক আহমেদ পেপারওয়েটটা ইমেইলের প্রিন্ট কপিটার ওপর রেখে ইমতিয়াজের বাবার দিকে চেয়ে বললো,আপনার ছেলে জানুয়ারির তেইশ তারিখে ইস্কান্দারকে ফোন দিয়েছিল হিভেন রিসোর্ট থেকে। ইস্কান্দারের পাঠানো বিষেই মিমকে মেরেছিল রাশেদ।মূল হোতা আপনার ছেলে ই। কেন করেছে সে প্রশ্নের উত্তর রিমান্ডে পাওয়া যাবে।
ইমতিয়াজের বাবা এ পর্যায়ে মোস্তাক আহমেদকে অবাক করে দিয়ে বললো, স্যার আপনাদের বড়সড় ভুলে হয়ে গেছে। জানুয়ারির তেইশ তারিখে আমার ছোট মেয়ের জন্মদিন ছিল।এইতো নাজমুল সাহেব,নাজমুল সাহেবে স্ত্রী, রিমি, যুথি,মিম সবাই সেখানে ছিল।ইমতিয়াজ সেদিন বাড়িতেই ছিল।জন্মদিন থেকে ঢাকা ফেরার কদিন পরেই নাজমুল সাহেবের স্ত্রী সুইসাইড করে।
মোস্তাক আহমেদ খানিকটা নড়েচড়ে বসে বললো,কি প্রমাণ আছে আপনার কাছে?।
যুথি মোস্তাক আহমেদকে বললো,আমরা ঐদিন ফেসবুক লাইভে এসেছিলাম কেক কাটার সময়।তাছাড়া অনেক ছবিও আছে।
যুথির মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে নাজমুল সাহেব বললো,সেদিন বেয়াইদের বাড়িতে পঞ্চাশেক লোকও ইমতিয়াজকে দেখেছে।তারা বড় প্রমাণ।
এত প্রমাণ যোগাড়ের পর,সন্দেহ তীব্র হবার পরেও ইমতিয়াজকে ছেড়ে দিতে হয় তার পক্ষে আরো স্পষ্ট প্রমাণ থাকায়।
মাস দেড়েক পর মোস্তাক আহমেদকে ডিবি ব্রাঞ্চ থেকে জানানো হয় তাদের কাছে ইনফরমেশন এসেছে মিম আর ঝুমুর কেসের মূল হোতাকে ধানমন্ডির মাস্কো প্লাজার পেছনের ফ্ল্যাটের তেরো নম্বর রুমে পাওয়া যাবে। মোস্তাক আহমেদ যেন ফোর্স নিয়ে দ্রুত সেখানে পৌঁছে যায়।
মোস্তাক আহমেদ তার টিম নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়েছে,লোকাল থানাকে আগে থেকেই ফোন দিয়ে নজরদারিতে থাকতে বলা হয়েছে।
চলবে…
লিখেছেনঃ Borhan uddin
#রুমাল, শেষ পর্ব।
মদ্যপ ও একাধিক নারীর সাথে আপত্তিকর অবস্থায় মাস্কো প্লাজার পেছনের ফ্ল্যাটের তেরো নম্বর রুম থেকে ডিবি পুলিশের দেয়া ইনফরমেশন অনুযায়ী আটক করা হয় ঝুমুর মিম হত্যার মূল হোতাকে।
ছিপছিপে গড়নের মাকসুদ দেখতে বেশ বোকাসোকা ধরনের।মোটা ফ্রেমের চশমার ভেতর দিয়ে সে বড্ড নিরীহ ভাবে তাকায়।
মদ্যপ অবস্থায় থাকায় সেদিনকার মত আর জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হয়নি।পরদিন সকালে সাজ্জাদকে দায়িত্ব দেয়া হয় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য।
সাজ্জাদের সামনের চেয়ারে বসানো হয়েছে মাকসুদকে।মাকসুদ খুব শান্ত চাহনি দিয়ে বললো,আমার ফ্ল্যাটে একটু রঙ তামাশা করলাম তাতেই ধরে নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করতে যাচ্ছেন!
সাজ্জাদ বেশ বুঝতে পারছে এই নিরীহ চেহারাটার ভেতর থেকে কথা বের করতে বড্ড কষ্ট হবে । কেননা তাদের হাতে স্পেসিফিক কোন প্রমাণ নেই,ডিবি পুলিশ বলছে কেউ একজন তাদেরকে খোলা চিঠি দিয়ে মাকসুদ সম্পর্কে জানিয়েছে।এতটুকু তথ্যের উপর ভিত্তি করে কাউকে দোষী প্রমাণ করাটা সহজ ব্যাপার নয়।সাজ্জাদ শীতল গলায় বললো, আপনার ঘরে দেখলাম বিদেশি হুইস্কিতে ভর্তি।আর যে মেয়েগুলো ছিল তাদের নাকি পার নাইট দশ হাজার করে দেন। এত টাকার সোর্স কি?
-বিজনেস।
কিসের বিজনেস আপনার?
-আলু, কুমড়া, লাউ। এইতো এগুলার বিজনেস।
আচ্ছা।তো কোথায় করেন এই বিজনেস?
-সিঙ্গাপুর,মায়ানমার, লেবানন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ সহ বেশ কয়টা দেশে।আচ্ছা স্যার একটু টিস্যু হবে? চশমাটা কেমন ঘোলাটে হয়ে আছে,আপনার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছেনা।
সাজ্জাদ টিস্যু পেপার এগিয়ে দিয়ে বললো,তা আপনার মালগুলো কিভাবে পাঠান?
মাকসুদ চশমাটা মুছে চোখ দিয়ে বললো,বাহ! আপনার মুখটা এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।বেশ সুদর্শন আপনি! ও! মালগুলো কিভাবে পাঠাই, তাই তো? জাহাজে পাঠাই। প্রোফিট আসে বেশ।
তো মালগুলো কেনেন কোন কোন জায়গা থেকে?
– দেশে তো ক্ষেতখামারের অভাব নেই
আচ্ছা।আলু,পটলের ব্যবসা করেন ভালো কথা।তবে সমস্যাটা বাঁধিয়েছেন অন্য জায়গায়।ঝুমুর, মিম,জহিরকে খুন করে।কেন খুন করলেন ওদের?
– এরা আবার কারা? আর আমি আলু,লাউয়ের ব্যবসায়ী। মদ,মেয়েতেই আমার দুনিয়া। আমি খুন খারাবি কেন করবো!
সাজ্জাদ বুঝতে পারছে মাকসুদ খুব ঠান্ডা মাথার খিলাড়ি। সাজ্জাদকে গতরাতে কক্সবাজার পুলিশ অফিসার আরমান মাহবুব ফোন করে জানিয়েছে হিভেন রিসোর্টের কেয়ার টেকার হামিদ দশ হাজার টাকার বিনিময়ে জানিয়েছে সিসিটিভি ফুটেজ ফারুক সাহেবের নির্দেশে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।সাজ্জাদের হিসেবও দুইয়ে দুইয়ে চার হয়ে যায়। মাকসুদের চোখে চোখ রেখে ফণী ধরা গোখরার মত সাজ্জাদ বললো,ফারুক সাহেবের সাথে তোর সম্পর্কটা কি?
মাকসুদ বুঝতে পারে সাজ্জাদের আপনি থেকে ‘তুই’ সম্বোধনে নেমে আসাটা তার জন্য সতর্কতা। মাকসুদ নিরীহ চাহনি দিয়ে বললো,ফারুক সাহেবটা আবার কে বলেন দেখি! কিসব নাম বলছেন যাদের চিনিই না আমি।
সাজ্জাদ গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে মাকসুদের ঠোঁট বরাবর ঘুষি মেরে বসে। মাকসুদ চেয়ার থেকে পড়তে যেয়েও পড়েনা। মাকসুদের ঠোঁট বেয়ে রক্ত ঝরছে,জিহ্বা দিয়ে রক্তবিন্দু চেটে নিয়ে থু দিয়ে ফেলে দেয় মাকসুদ। সাজ্জাদের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
-আমি ফারুক নামের কাউকে চিনিনা,এই অন্যায়ে আপনি আমাকে মারলেন?
সাজ্জাদ ঠোঁটের কোণে হাসি এনে বললো,তোর মস্তিষ্ক বড্ড শীতল।বড় খেলোয়াড়দের মস্তিষ্ক এমনিতেই শীতল হয়। তা তোর ফারুক বাপ যে কাল রাতে ভিডিও পাঠালো তুই জানুয়ারির তেইশ তারিখে ওর হিভেন রিসোর্টে ছিলি।ওখান থেকেই তুরস্কের ইস্কান্দারকে টেলিফোনে করেছিলি সেই প্রমাণ তো আগে থেকেই আছে।এতসব প্রমাণের বিরুদ্ধে তোর মুখের কথা আইনে টিকবে না।ফাঁসিতে ঝুলবি এটা নির্ঘাত, কেন মারলি ওদের সেটা বলে দে।মানবিক কোন ব্যাপার স্যাপার থাকলে ফাঁসির হাত থেকে বাঁচতেও পারিস।
মাকসুদের চেহারায় বিচলিত হবার ছাপ স্পষ্ট। সাজ্জাদের কৌশল কাজ করতে শুরু করেছে।মাকসুদ কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে আবার নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে কৃত্রিম হাসি দিয়ে বললো,
-ওহ! হিভেন রিসোর্টের কথা বলছেন? আমি তো বেড়াতে গিয়েছিলাম কক্সবাজার, তখন ওখানেই উঠেছিলাম।আর তুরস্কের ইস্কান্দার না কি যেন বললেন, তাকে আমি ফোন করতে যাব কেন?
চার নম্বর রুমে সেদিন তুই ই ছিলি।আর কেউ ছিল না।আর ফোনটা যেহেতু সেই রুম থেকেই গিয়েছে তার মানে তুই ই করেছিলি।ইস্কান্দারকে তুর্কি পুলিশ ধরেছে অনেক আগেই,আমাদের হাতে তোকে আটকানোর সব প্রমাণ আছে।বেরোনোর রাস্তা বন্ধ তোর।এবার তোর গল্প বলার পালা।বল,শুনি।
-আমি কাউকে ফোন করিনি।আপনারা খামাখাই আমাকে দোষারোপ করছেন।আর আমি সারাক্ষণ রুমে ছিলাম না,আমার অনুপস্থিতিতে অন্য কেউ ফোন করতেই পারে।
হা হা,নিজেকে বাঁচানোর জন্য তোর এই মিথ্যাটা আদালতে টিকবেনা।তুই রুম লক করে গিয়েছিলি নিশ্চয়ই আর না গেলে তোর দায়িত্বে থাকা রুম থেকে কেউ ফোন করলে সেটা তোর উপরই বর্তায়। সাজ্জাদ আরো কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল,এর মাঝে খবর এলো মোস্তাক আহমেদ তাকে ডেকে পাঠিয়েছে।
মিনিট দশেক ফিরে আবার সেলে ফিরে আসলো সাজ্জাদ।মাকসুদের চেহারায় সেই নির্ভার ভাবটা একদম ই নেই। বেশ বিচলিত দেখাচ্ছে তাকে।
সাজ্জাদ পেছন থেকে মাকসুদের চুল মুঠিতে ধরে ঝাঁকিয়ে বললো,সময় নষ্ট করিস না একদম। সাফসাফ উত্তর দে তোর চারটা ব্যাংক একাউন্টে সব মিলিয়ে বিশ কোটি টাকার বেশি আছে এর সোর্স কি?
মাকসুদ নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না।মাথাটা ঝাঁড়ি দিয়ে সাজ্জাদের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে বললো,বললাম ই তো আলু,লাউয়ের বিজনেস।
সাজ্জাদ পেছন থেকে উড়ো লাথি মারে মাকসুদকে।সামনে টেবিল থাকায় টেবিলে ঘা খেয়ে রাবারের বলের মত পেছন দিকে ছুটে এসে ফ্লোরে পড়ে যায়।সাজ্জাদ মাকসুদের বুকের উপর তিন চারটা লাথি মারতেই মাকসুদ গুঙিয়ে কেঁদে ওঠে।সাজ্জাদ দায়িত্বে থাকা রমজানকে বললো,ওই রমজান কাঁচি, ছুরি নিয়ে আসো।কুত্তার বাচ্চার এক একটা আঙুল কেটে ওর পকেটে পুরে দেবো । এটুকু বলেই শার্টে কলার ধরে মাকসুদকে চেয়ারে উঠিয়ে বসাতেই মাকসুদ সাজ্জাদের পায়ে ধরে বললো,স্যার আমাকে আর মারবেন না প্লিজ।আমি কিছু করিনি স্যার।
রমজান,নেয়াজ ছুরি,কাঁচি নিয়ে সেলের ভেতর ঢুকছে।সাজ্জাদ বললো,দড়ি দিয়ে একে বাঁধো।তোমরা এর হাত ধরবা আর আমি আঙুল কেটে কেটে ওর পকেটে ঢুকিয়ে দেবো।
রমজান পাশে থাকা দড়ি দিয়ে মাকসুদকে চেয়ারের সাথে জোর জবরদস্তি করে বেঁধে দিল।রমজান,নেয়াজ টেবিলের সাথে মাকসুদের হাত চেপে ধরেছে,সাজ্জাদ ছুরি দিয়ে মাকসুদের বুড়ো আঙুলের বেশ খানিকটা কেটে দিতেই গলগলিয়ে রক্ত বের হয়ে এলো।মাকসুদ মাগো বলে চিৎকার করে উঠে বললো,স্যার আমি সব বলছি।সাজ্জাদ ছুরিটা রেখে বললো,বল তাহলে।মাকসুদ ক্রন্দন সুরে বললো
-আমাকে খুব জঘন্য ভাবে ঠকিয়েছিল মিম আর মিমের মা।আমি সুইসাইড করতে গিয়ে বেঁচে গিয়েছিলাম ভাগ্যগুণে। এটুকু বলেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো মাকসুদ।
সাজ্জাদ খানিক্ষন সময় নিয়ে বললো,পুরোটা বল।
-আমার তখন গ্রাজুয়েশন শেষ।ইন্টারমিডিয়েটে পড়া মিমের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যায়।সম্পর্কের বয়স মাস না পেরোতেই মিমের মা সবটা জেনে যায়।একদিন উনি মিমকে নিয়ে আমার সাথে দেখা করলেন।আমার বাবা মারা গেছে ছোটবেলাতেই,মা মারা গেছে আমি যখন টেনে পড়ি তখন।মা না থাকায় প্রথম দেখাতেই মিমের মাকে আমি মা বলে ডাকি।তিনি আমার সব কথা শুনে,আমি এতিম জেনে,মিমের প্রতি আমার ভালোবাসা দেখে তিনি বললেন আমি যেন দ্রুত কিছু একটা করে নিই।আর আমরা যেন বেশি মেলামেশা না করি।মিমের বাবার তখন দিনাজপুরে পোস্টিং ছিল। মিমের চেয়ে মিমের মায়ের সাথেই আমার তখন সারাদিন কথা হতে লাগল।আমার মনে হচ্ছিল আমি মা ফিরে পেয়েছি।আমি একটা প্রাইভেট ফার্মে মোটামুটি এমাউন্টের জব জুটিয়ে নিয়েছিলাম।বেতনের বড় অংশটা দিয়ে মিমের পড়াশুনার যাবতীয় খরচ চালাতাম আমিই,মিমদের তখন টানাটানির সংসার।আমি একটা বাসাও ভাড়া নিয়ে বেশ গুছিয়ে ফেলেছিলাম।আমি যখন মিমের মাকে বললাম আমি মিমকে বিয়ে করতে চাই তিনি তখন বললেন,মিমের বাবাকে ছাড়া তিনি কিছু করতে পারবেন না আর গভমেন্ট জবের সাথে ভালো এমাউন্ট ছাড়া কোন ছেলের কাছে মিমের বাবা নাকি তুলে দিবেন না।অথচ তিনি প্রায়ই বলতেন তিনি মিমকে আমি যখন চাইব তখনই আমার হাতে তুলে দিবে। আমি প্রথমে দমে গেলেও পুরো উদ্যমে বেটার জবের জন্য উঠে পরে লাগি।এর মাঝে মিমের মা শুধু আমার ত্রুটি খুঁজত,নানা শর্ত জুড়ে দিতে লাগলো।মিমের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা চলে আসলো,মিমের মা আমাকে বললো আমি যেন পরীক্ষার সময় বেশি কথা না বলি।আমিও কথা বলা কমিয়ে দিলাম।এর মাঝে আল্ট্রাটেকে আমি জুনিয়র মার্কেটিং অফিসার পদে যোগ দিলাম। স্যালারি ছিল প্রায় চল্লিশ হাজারের মত।স্যার একটু পানি দিবেন?
সাজ্জাদ রমজানকে দিয়ে পানি আনালে মাকসুদ ঢকঢক করে পানি খেয়ে আবার বলতে শুরু করলো
-মিমের মা খুব খুশি হলেন শুনে।এর মাঝে মিমের পরীক্ষা শেষ হবার দুদিন আগে কোম্পানি থেকে আমাকে তুরস্কে পাঠানো হলো চার মাসের জন্য।আমি তুরস্ক যাবার পর থেকে আর কোন যোগাযোগ হয়নি মিমের মা কিংবা মিমের সাথে। আসলে উনারা সিম বদলে ফেলেছিল।আমি ট্রেনিং এ ঠিকঠাক মন বসাতে পারতাম না।অনেক কষ্টে চারটা মাস শেষে দেশে এসেই শান্তিনগরে মিমদের বাসায় ছুটে গিয়ে জানতে পারি মিমের বাবার ঢাকায় পোস্টিং হওয়ায় তারা বাসা ছেড়ে চলে গেছে আর মিমেরও নাকি বিয়ে হয়ে গেছে। মিমের এক ফ্রেন্ড বললো,মিমের নাকি বিশাল টাকাপয়সা ওয়ালা লোকের সাথে বিয়ে হয়েছে।মিমের মা মেয়ের জামাইয়ের টাকা এনে বিলাসিতা করে।মিমের বিয়ের ছবিও সে দেখালো।আসলে মিমের মা চেয়েছিল মিমের পরীক্ষাটা যেন ভালোই ভালোই হয়।আর পরীক্ষা শেষ হলেই মিম বাড়ি থেকে বের হতে পারবেনা তাই পরীক্ষার আগ পর্যন্ত আমার সাথে ভালো ব্যবহার করে গিয়েছিল।মিমের মা প্ল্যান করেই আমাকে মায়াতে আটকে রেখেছিল,এটা তার ট্রিক ছিল।
সাজ্জাদ বললো,মিমের মায়ের সাথে রাশেদের সেক্স ভিডিও ভাইরাল করলি তাকে সুইসাইড করতে বাধ্য করতে?
– না।আমি চেয়েছিলাম আমি তাকে নিজ হাতে মারবো। তার আগে লোভী, ভণ্ড মহিলাটাকে চুড়ান্ত অপদস্থ করতে চেয়েছিলাম। তাই জহিরকে দিয়ে রাশেদকে ম্যানেজ করেছিলাম।রাশেদ প্রায় সৌদি,তুরস্কে যেত।আমার প্ল্যান অনুযায়ী রাশেদ ছাড়া বেস্ট ট্রাম্পকার্ড হিসেবে আর কাউকেই পেতাম না।
কিন্তু আমি মিমের মাকে মারার আগেই সে ই সুইসাইড করল। আমার খুনের নেশাটা তখনো চেপে ছিল। পরে সব খোঁজখবর নিয়ে তুরস্ক থেকে বিষ আনিয়ে মিমকে মারলাম।
রুমালে বিষ মাখিয়েই মারলি কেন?
– মিম নকশা করা রুমাল খুব পছন্দ করত।আমি নিশ্চিত ছিলাম মিম ঐ নকশা করা রুমাল দেখলে না কিনে পারবেনা। ঠিক একই নকশা করা রুমাল ও আমাকে নিজে সেলাই করে আমার জন্মদিনে দিয়েছিল।তাই সেইম নকশা করা রুমালে বিষ মাখিয়ে দিলে যে সে না কিনে পারবেনা সেটা আমার জানাই ছিল।পলিথিনে মুড়ে দিয়েছিলাম কারণ ও খুব শুচিবাই স্বভাবার ছিল।
রিসোর্টের এন্ট্রি খাতায় মিমের স্বামীর নাম লিখলি এমনকি সিগনেচারও নকলি করলি যাতে সন্দেহটা মিমের স্বামীর দিকে যায় তাই তো?
-হ্যাঁ।ঠিক এই কারণেই জহিরের সাথে রাজশাহীর ভাষায় কথা বলতাম।যাতে সন্দেহর প্রতিটা তীর মিমের স্বামীর দিকে যায়।
জহিরকে মারলি কেন?
-শুয়োরটা কদিন পরপরই টাকা চাইতে লাগল।এর মাঝে ওকে কোনভাবে আমি ভুল করে আমার নাম বলে ফেলেছিলাম।মিমের ছোট বোনটা আবার আমার নাম জানত।তাই আর রিস্ক নিই নি।প্রফেশনাল কিলার দিয়ে জহিরকে মিরসরাইয়ে তুলে নিয়ে গলা কেটে দিলাম।
তুরস্ক থেকে বিষ আনালি,লাখ টাকার ব্যাপার।রাশেদে একাউন্টে তুই অনেকগুলো টাকা দিয়ে রেখেছিলি যাতে রাশেদকে সন্দেহ করে কেসটা অন্ধকারে চলে যায়। এত টাকার সোর্স কি তোর?
– অবৈধ অস্ত্র ব্যবসার সাথে জড়িয়ে আছি আমি।যে দেশগুলোর কথা বলেছি ওখান থেকে লাইসেন্স বিহীন অস্ত্র এনে দেশে সাপ্লাই দিই আমি।
তোর সাথে আর কে আছে?
-মাকসুদ হাতের ব্যথা,মুখের ব্যথা নিয়েও হো হো করে হেসে উঠে বললো,এখনো বুঝলেন না? আপনাদের নেতা ফারুক সাহেব, নাটের গুরু।তার সাথে পরিচয়ের পর থেকেই এই ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়া।তবে তাকে ধরতে পারবেন না আপনারা।শুয়োরে বাচ্চা ফারুকের কাছে লাস্ট চালানের ভাগের দেড় কোটি টাকা পাই এখনো। যাতে টাকা দিতে না হয় তাই আমাকে ধরিয়ে দিল!
সাজ্জাদ এমন কিছু একটা আঁচ করতে পারছিল।সাজ্জাদ দ্রুত গলায় বললো,ওর সঙ্গে সব ইনফরমেশন দে।ওর ব্যবসা করাচ্ছি ওকে।ওরে এমন ডলা দেব।
-মাকসুদ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো,ও নিজে থেকে আপনাদের সবটা জানিয়েছে। ও গোডাউন চেইঞ্জ না করে, সব ইনফরমেশন হাইড না করে আপনাদেরকে আমার কথা জানায়নি। কিচ্ছু করতে পারবেন না ওর।
সাজ্জাদের ফোনে কল আসাতে সাজ্জাদ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো,তুই আবারো ঠকলি।ফারুক সাহেব আমাদের কিছুই জানায়নি।আমি আন্দাজ করেছিলাম। ফারুক সাহবে যেহেতু সিসিটিভি ফুটেজ সরিয়ে ফেলেছে তাই ওর কোন একটা স্বার্থ আছে।সেই আন্দাজ থেকেই তোর দিকে ঢিল ছুড়লাম।রমজান আসলে ফারুকের সব ইনফরমেশন দিয়ে দিস এটুকু বলেই সাজ্জাদ বেরিয়ে গেলো।
মাকসুদ হেসে উঠলো।জীবনে প্রথমবারের মত কারো কাছ থেকে ঠকে যেয়েও কাঁদল না সে।
লিখেছেনঃBorhan uddin